রাজধানীর রামপুরায় দিনেদুপুরে প্রকাশ্যে গুলিবিদ্ধ হওয়ার ঠিক এক সপ্তাহ পর হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা গেছেন পুলিশের তালিকাভুক্ত ‘শীর্ষ সন্ত্রাসী’ ইয়াসিন খান পলাশ। অপরাধ জগতে তিনি ‘কাইল্লা’ পলাশ নামেই বেশি পরিচিত ছিলেন। শুক্রবার দিবাগত রাত ১টার দিকে রাজধানীর একটি বেসরকারি হাসপাতালে শেষ নিশ্বাস ত্যাগ করেন তিনি।
হাতিরঝিল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা বা ওসি) মো. আসাদুজ্জামান তার মৃত্যুর বিষয়টি আনুষ্ঠানিকভাবে নিশ্চিত করেছেন। তিনি জানান, আইনি প্রক্রিয়া শেষে লাশ ময়নাতদন্তের জন্য মর্গে পাঠানোর ব্যবস্থা করা হচ্ছে। ময়নাতদন্তের প্রতিবেদন হাতে পেলে মৃত্যুর সুনির্দিষ্ট কারণ ও আঘাতের ধরন আরও স্পষ্টভাবে নথিবদ্ধ করা সম্ভব হবে।
পুলিশ ও স্থানীয় প্রত্যক্ষদর্শীদের সূত্রে জানা যায়, গত ১২ জুন দুপুর পৌনে ২টার দিকে রামপুরায় বাংলাদেশ টেলিভিশন (বিটিভি) ভবনের উল্টো দিকে নিজের বাসার কাছাকাছি এলাকায় একদল সশস্ত্র দুর্বৃত্তের অতর্কিত হামলার শিকার হন পলাশ। সেখানে তাকে লক্ষ্য করে খুব কাছ থেকে এলোপাতাড়ি গুলি চালানো হয়। রক্তাক্ত ও গুরুতর আহত অবস্থায় তাকে উদ্ধার করে দ্রুত ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। সেখানে নিবিড় পর্যবেক্ষণে রেখে দুই দিন চিকিৎসা দেওয়ার পরও তার শারীরিক অবস্থার কোনো উন্নতি হয়নি। পরে উন্নত চিকিৎসার আশায় গত রোববার রাতে তাকে বেসরকারি এভারকেয়ার হাসপাতালে স্থানান্তর করে পরিবার। সেখানেই দীর্ঘ এক সপ্তাহ মৃত্যুর সঙ্গে পাঞ্জা লড়ে অবশেষে শুক্রবার গভীর রাতে তিনি মারা যান।
এই রোমহর্ষক ও চাঞ্চল্যকর হামলার পর পলাশের স্ত্রী মাহমুদা খানম বাদী হয়ে হাতিরঝিল থানায় একটি হত্যাচেষ্টা মামলা দায়ের করেছিলেন। যেহেতু ভুক্তভোগী এখন মারা গেছেন, তাই আইনি বিধি অনুযায়ী মামলাটি এখন সরাসরি হত্যা মামলায় রূপান্তরিত হবে। দায়ের করা ওই এজাহারে অপরাধ জগতের আরেক আলোচিত ‘শীর্ষ সন্ত্রাসী’ জিসান আহমেদ মন্টিকে প্রধান আসামি করা হয়েছে।
মামলার এজাহারে জিসান ছাড়াও আরও ১০ জনের নাম সুনির্দিষ্টভাবে উল্লেখ করা হয়েছে। তারা হলেন—বাদশা ওরফে গুজা বাদশা (৪৮), গলদা বাদশা (৪৫), শান্ত ওরফে পিচ্চি শান্ত (২৮), সোলাইমান খন্দকার (৪৫), ফারুক ওরফে চাচা ফারুক (৩৫), হেবেল (৩৫), মোল্লা জনি (৪২), ফিরোজ মোহাম্মদ মোল্লা (৪৫), পিচ্চি আলামিন ওরফে তোতলা আলামিন এবং সজীব (৩৫)। এর বাইরে অজ্ঞাতপরিচয় আরও সাত থেকে আটজনকে এই মামলায় আসামি করা হয়েছে। এজাহারে বাদী মাহমুদা খানম অভিযোগ করেন, পূর্বপরিকল্পিতভাবে এবং পরস্পরের যোগসাজশে পেশাদার এক অস্ত্রধারী সন্ত্রাসী তার স্বামীকে হত্যার পরিষ্কার উদ্দেশ্যে এই গুলি চালিয়েছে।
চাঞ্চল্যকর এই ঘটনার পর আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী আসামিদের ধরতে ব্যাপক তল্লাশি শুরু করে। গত শনিবার রাজধানীর বাড্ডা এলাকা থেকে ইমাম হোসেন নামে সন্দেহভাজন একজনকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। তদন্তকারী কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, পলাশকে লক্ষ্য করে গুলি ছোড়া মূল হামলাকারী যে মোটরসাইকেলে করে ঘটনাস্থল থেকে পালিয়ে গিয়েছিল, সেই মোটরসাইকেলের চালক ছিলেন এই ইমাম হোসেন। এরপর গত সোমবার র্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়ন (র্যাব) ফেরদৌস নামে আরও একজনকে গ্রেপ্তার করে হাতিরঝিল থানায় হস্তান্তর করে। পুলিশের দাবি, ঘটনার দিন ঘটনাস্থল ও এর আশপাশে সন্দেহজনকভাবে অবস্থান করে হামলাকারীদের সহায়তা করেছিলেন এই ফেরদৌস।
এদিকে, নিহত পলাশের বিরুদ্ধেও গুরুতর সব অপরাধের অভিযোগ রয়েছে। হাতিরঝিল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা আসাদুজ্জামান জানান, ইয়াসিন খান পলাশ এলাকার একজন চিহ্নিত অপরাধী ছিলেন। তার বিরুদ্ধে হত্যাসহ অন্তত সাতটি মারাত্মক অপরাধের মামলা বিচারাধীন রয়েছে। রাজধানীর অপরাধ জগতের আধিপত্য বিস্তার, চাঁদাবাজি বা অভ্যন্তরীণ কোন্দলের জেরেই এই প্রকাশ্য হত্যাকাণ্ডের ঘটনা ঘটতে পারে বলে প্রাথমিকভাবে ধারণা করছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। পলাতক অন্যান্য আসামিদের ধরতে পুলিশের একাধিক দল মাঠে কাজ করে যাচ্ছে।