লক্ষ্মীপুরের রায়পুর পৌর শহরের একটি বহুতল ভবনে ঢুকে মা ও তাঁর তিন মেয়েকে নৃশংসভাবে কুপিয়ে হত্যার ঘটনায় মামলা হয়েছে। এই বর্বরোচিত হত্যাকাণ্ডে পরিবারটির একমাত্র বেঁচে থাকা সদস্য ও নিহত শাহিনুরের ছেলে জুনাইদ ইসলাম সিফাত বাদী হয়ে রায়পুর থানায় মামলাটি করেছেন। মামলায় অজ্ঞাতপরিচয় ব্যক্তিদের আসামি করা হয়েছে।
শুক্রবার (২৬ জুন) বিকেলে মামলাটি করা হয় বলে নিশ্চিত করেছে পুলিশ। এর আগে বৃহস্পতিবার (২৫ জুন) সকালে রায়পুর পৌরসভার ধানহাটা নদী পাড় সড়ক এলাকার আমির হোসেন মাস্টারের পাঁচতলা ভবনের নিচতলার ফ্ল্যাটে (আবাসিক কক্ষ) এই লোমহর্ষক হত্যাকাণ্ডের ঘটনা ঘটে। নিহতরা হলেন—শাহিনুর বেগম (৩৮), তাঁর বড় মেয়ে সায়মা আক্তার (২১), মেজ মেয়ে নাফিসা আক্তার ইকরা (১৭) ও ছোট মেয়ে ফাতেমা আক্তার শিফা (১০)।
পুলিশ ও প্রত্যক্ষদর্শীদের সূত্রে জানা গেছে, ঘটনার দিন সকালে খুনি ওই বাসায় ঢুকে চারজনকে এলোপাতাড়ি কোপাতে শুরু করে। ভেতর থেকে চিৎকার শুনে স্থানীয় এক বাসিন্দা আফরোজা বেগম রানী তাৎক্ষণিকভাবে বুদ্ধিমত্তা খাটিয়ে নিচতলার মূল ফটকটি বাইরে থেকে আটকে দেন। এতে অভিযুক্ত যুবক অন্তর মজুমদার ভবনের ভেতরে আটকা পড়েন। পরবর্তীতে আশপাশের লোকজন এসে ঘরের মেঝেতে মা ও তিন মেয়ের রক্তাক্ত মরদেহ পড়ে থাকতে দেখেন।
এদিকে আটকা পড়া অন্তর মজুমদার ভবনের ছাদে উঠে পাশের অন্য একটি ভবনের ছাদ দিয়ে পালিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করেন। তবে স্থানীয় বাসিন্দারা তাঁকে ধরে গণপিটুনি দিলে ঘটনাস্থলেই তাঁর মৃত্যু হয়। জানা গেছে, অভিযুক্ত অন্তর মজুমদার প্রায় দেড় বছর ওই ভবনেরই পঞ্চম তলায় ভাড়াটিয়া হিসেবে বসবাস করতেন। তবে আট মাস আগে তিনি বাসা ছেড়ে চলে যান।
নিহতদের স্বজনদের ধারণা, এই হত্যাকাণ্ডের পেছনে মূলত ডাকাতি ও অর্থ লুটের উদ্দেশ্য ছিল। নিহত শাহিনুর বেগমের ছোট ভাই ছানা উল্লাহ জানান, তাঁর বোনের কিছু স্বর্ণালংকার ছিল। সেগুলো লুট করতেই অন্তর এই কাণ্ড ঘটিয়েছে। তবে এর পেছনে অন্য কেউ জড়িত আছে কি-না, তা গুরুত্বসহকারে তদন্তের দাবি জানান তিনি।
মাতৃ-পিতৃহীন ও বোনদের হারিয়ে দিশেহারা একমাত্র ছেলে সিফাত জানান, বাড়িওয়ালা না থাকলে তাঁর মায়ের কাছেই ভবনের অন্য ভাড়াটিয়ারা ভাড়ার টাকা জমা দিতেন। পরবর্তীতে বাড়িওয়ালা এসে সেই টাকা নিয়ে যেতেন। এছাড়া তাঁর মায়ের কিছু স্বর্ণালংকারও বাসায় ছিল। এসব টাকা ও স্বর্ণের লোভে অন্তর এই হত্যাকাণ্ড ঘটিয়ে থাকতে পারে।
এদিকে এই হত্যাকাণ্ডে কেবল একজনই জড়িত ছিল নাকি নেপথ্যে কোনো বড় চক্র রয়েছে, তা নিয়ে জনমনে সংশয় তৈরি হয়েছে। রায়পুর বণিক সমিতির সভাপতি সাইফুল ইসলাম মুরাদ জানান, একজন মানুষের পক্ষে একই সময়ে চারজনকে কুপিয়ে হত্যা করা সম্ভব কি-না, তা নিয়ে পুরো এলাকায় ধোঁয়াশা রয়েছে। খুনের পেছনে অন্য কারও সংশ্লিষ্টতা আছে কি-না, তা খতিয়ে দেখতে পুলিশের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন তিনি।
রায়পুর থানার ওসি (ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা) শাহীন মিয়া জানান, ময়নাতদন্তের প্রক্রিয়া শেষে নিহতদের মরদেহ পরিবারের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে। নিহত শাহিনুরের ছেলের করা মামলার ভিত্তিতে তদন্ত শুরু হয়েছে। ঘটনার নেপথ্যে অন্য কোনো রহস্য বা সহযোগী কেউ রয়েছে কি-না, তা বের করতে তদন্ত অব্যাহত রয়েছে।