লালমনিরহাটের সীমান্তবর্তী অঞ্চলের লাখো মানুষের একমাত্র ভরসা ২৫০ শয্যা বিশিষ্ট জেলা সদর হাসপাতাল। কিন্তু জীবন রক্ষাকারী জলাতঙ্কের (র্যাবিস) টিকার অভাবে বর্তমানে এই চিকিৎসা কেন্দ্রে সেবা নিতে আসা মানুষ চরম বিপাকে পড়েছেন। সরকারি সরবরাহ বন্ধ থাকায় দরিদ্র রোগীদের পকেট কেটে বাইরের দোকান থেকে চড়া দামে টিকা কিনতে হচ্ছে।
লালমনিরহাট জেলা সদর হাসপাতালে সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, প্রতিদিন সকাল থেকেই কুকুর, বিড়াল কিংবা বেজির কামড়ে আক্রান্ত রোগীরা ভিড় জমাচ্ছেন। দীর্ঘ সময় লাইনে দাঁড়িয়ে অপেক্ষা করার পর যখন তারা শুনছেন হাসপাতালে সরকারি টিকা নেই, তখন তাদের কপালে চিন্তার ভাঁজ পড়ছে। বিশেষ করে নিম্নবিত্ত ও সুবিধাবঞ্চিত মানুষেরা এই সংকটে সবচেয়ে বেশি দিশেহারা হয়ে পড়েছেন।
সরকারি নিয়ম অনুযায়ী জলাতঙ্কের এই টিকা বিনামূল্যে পাওয়ার কথা। কিন্তু বর্তমানে হাসপাতালের স্টোর বা ভাণ্ডারে টিকার কোনো মজুত নেই। ফলে রোগীদের বাধ্য হয়ে বাইরের ওষুধের দোকান থেকে চড়া মূল্যে প্রতিষেধক কিনতে হচ্ছে। টিকার প্রতিটি শিশির (ভায়াল) দাম সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতার বাইরে হওয়ায় অনেক সময় দেখা যাচ্ছে ৫ জন রোগী মিলে টাকা ভাগাভাগি করে একটি শিশি কিনছেন। এই চিত্র লালমনিরহাটের স্বাস্থ্য ব্যবস্থার এক করুণ দশাকেই ফুটিয়ে তুলছে।
ভুক্তভোগীদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, আক্রান্তদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য সংখ্যকই শিশু। সদর উপজেলার কুলাঘাট থেকে আসা এক অভিভাবক কান্নায় ভেঙে পড়ে বলেন, "হাসপাতালে আসলাম একটু সাহায্যের আশায়, কিন্তু ডাক্তার বলে বাইরে থেকে কিনে আনতে। ঘরে টাকা নেই, এখন শিশুকে নিয়ে কোথায় যাব? একদিকে জলাতঙ্কের ভয়, অন্যদিকে টাকার চিন্তা—গরিব মানুষের মরণ ছাড়া আর পথ নেই।"
এ বিষয়ে হাসপাতালের প্রশাসনিক কর্মকর্তাদের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তারা সংকটের সত্যতা স্বীকার করেন। লালমনিরহাট সদর হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়ক ডা. আবু আল হাজ্জাজ জানান, মূলত সরকারি কেন্দ্রীয় প্রকল্প থেকে টিকার সরবরাহ বন্ধ থাকার কারণেই এই সমস্যার সৃষ্টি হয়েছে। তিনি আরও জানান যে, হাসপাতালের নিজস্ব জরুরি তহবিল থেকে টিকা কেনার পরিকল্পনা থাকলেও বাজেটের সীমাবদ্ধতার কারণে তা করা সম্ভব হচ্ছে না। সরকারিভাবে বড় আকারের চালান না আসা পর্যন্ত এই ভোগান্তি থেকে সহসা মুক্তি মিলছে না বলে আশঙ্কা প্রকাশ করেন তিনি।
একটি আধুনিক রাষ্ট্রে জলাতঙ্কের মতো মারাত্মক ও প্রাণঘাতী রোগের টিকা সরকারি হাসপাতালে না থাকা কেবল দুঃখজনক নয়, বরং জনস্বাস্থ্যের প্রতি এক চরম অবহেলা। লালমনিরহাটের মতো সীমান্তবর্তী ও দরিদ্র এলাকায় এই সংকট বড় ধরনের স্বাস্থ্য ঝুঁকি তৈরি করতে পারে। বাজেট বা প্রশাসনিক দোহাই দিয়ে জীবন রক্ষাকারী ওষুধের সরবরাহ বন্ধ রাখা কখনোই কাম্য নয়। অবিলম্বে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের হস্তক্ষেপ এবং টিকার নিরবচ্ছিন্ন সরবরাহ নিশ্চিত করা এখন সময়ের দাবি।