আওয়ামী লীগ সরকারের টানা ১৬ বছরের শাসনামলে শিক্ষাখাতে সংঘটিত বিশাল অংকের অনিয়ম ও দুর্নীতির ফিরিস্তি জনসমক্ষে আনতে ‘শ্বেতপত্র’ (সরকারের বিশেষ তথ্যসংবলিত প্রতিবেদন) প্রকাশের ঘোষণা দিয়েছেন শিক্ষামন্ত্রী আ ন ম এহছানুল হক মিলন। বৃহস্পতিবার জাতীয় সংসদের অধিবেশনে প্রশ্নোত্তর পর্বে তিনি এই তথ্য নিশ্চিত করেন।
বৃহস্পতিবার বিকেলে স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদের সভাপতিত্বে সংসদের বৈঠক শুরু হলে প্রশ্নোত্তর টেবিলে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের এই পরিকল্পনা তুলে ধরা হয়। পাবনা-৫ আসনের সংসদ সদস্য শামছুর রহমান শিমুলের এক প্রশ্নের জবাবে শিক্ষামন্ত্রী জানান, ২০০৮-০৯ অর্থবছর থেকে ২০২৪-২৫ অর্থবছর পর্যন্ত শিক্ষাখাতের যাবতীয় প্রশাসনিক ও আর্থিক অনিয়ম খতিয়ে দেখার সিদ্ধান্ত নিয়েছে বর্তমান সরকার। এই দীর্ঘ সময়ের দুর্নীতির চিত্র তুলে ধরতে একটি সমন্বিত তদন্ত প্রতিবেদন তৈরির জন্য সংশ্লিষ্ট বিভাগগুলোকে ইতোমধ্যে কঠোর নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।
শিক্ষামন্ত্রী সংসদকে আশ্বস্ত করে বলেন, তদন্ত ও যাচাই-বাছাইয়ের কাজ শেষ হওয়া মাত্রই পর্যায়ক্রমে শ্বেতপত্রটি জনসমক্ষে আনা হবে। তবে তদন্তের পরিধি অত্যন্ত ব্যাপক ও বিস্তৃত হওয়ায় এটি সম্পন্ন করতে ঠিক কতদিন সময় লাগবে, তা এখনই নির্দিষ্ট করে বলা সম্ভব নয় বলে তিনি উল্লেখ করেন।
সংসদ অধিবেশনে বেসরকারি শিক্ষকদের অবসরকালীন সুবিধা নিয়েও গুরুত্বপূর্ণ তথ্য উঠে আসে। রংপুর-১ আসনের সংসদ সদস্য রায়হান সিরাজীর প্রশ্নের উত্তরে মন্ত্রী জানান, বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান শিক্ষক ও কর্মচারী অবসর সুবিধা বোর্ডে বর্তমানে ৮০ হাজার ৩২০টি আবেদন জমে আছে। এই বিশাল পরিমাণ পাওনা মেটাতে ৯ হাজার ৬৩৮ কোটি টাকার প্রয়োজন। বর্তমানে প্রায় ৬০ হাজার আবেদন নিষ্পত্তির অপেক্ষায় রয়েছে, যার জন্য সরকারের দরকার অন্তত সাত হাজার ১৭৬ কোটি টাকা।
মন্ত্রী আরও জানান, চলতি অর্থবছরে সরকার ২০ হাজার ৫০০টি আবেদন নিষ্পত্তির লক্ষ্যমাত্রা হাতে নিয়েছে। এ লক্ষ্যে দুই হাজার ৪৬২ কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছে। ইতোমধ্যে ৬ হাজার আবেদন নিষ্পত্তি করে ৭০০ কোটি টাকা প্রদান করা হয়েছে। তবে উদ্বেগের বিষয় হলো, কল্যাণ ট্রাস্টের আয়ের তুলনায় ব্যয় বেশি হওয়ায় প্রতি বছর প্রায় ১৮০ কোটি টাকার ঘাটতি দেখা দিচ্ছে।
অন্যদিকে, মানিকগঞ্জ-২ আসনের সংসদ সদস্য মঈনুল ইসলাম খানের এক প্রশ্নের জবাবে শিক্ষামন্ত্রী জানান, সারাদেশে এমপিওভুক্ত (বেতন বাবদ সরকারি অনুদান প্রাপ্ত) শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে বর্তমানে ৭৭ হাজার ২২৭টি পদ শূন্য রয়েছে। ডিজিটাল পদ্ধতিতে (ই-রিকুইজিশন) এই শূন্য পদের তালিকা চূড়ান্ত করা হয়েছে এবং দ্রুততম সময়ের মধ্যে নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করে যোগ্য প্রার্থীদের মাধ্যমে এই সংকট দূর করা হবে।
এছাড়া জয়পুরহাট-১ ও নীলফামারী-১ আসনের সংসদ সদস্যদের প্রশ্নের জবাবে মন্ত্রী বলেন, শর্ত পূরণ সাপেক্ষে নন-এমপিও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এবং এক হাজার ৩২৭টি স্বতন্ত্র ইবতেদায়ী মাদ্রাসা পর্যায়ক্রমে এমপিওভুক্ত করার প্রক্রিয়া চলমান রয়েছে।
একই অধিবেশনে গৃহায়ন ও গণপূর্তমন্ত্রী জাকারিয়া তাহের জানান, নিম্নআয়ের মানুষের আবাসন সমস্যা সমাধানে রাজধানীর কড়াইল বস্তিসহ ৫৮টি স্থান চিহ্নিত করা হয়েছে, যেখানে সরকারি-বেসরকারি অংশীদারিত্বে এক লাখ ফ্ল্যাট নির্মাণ করা হবে।
শিক্ষাখাতে দীর্ঘদিনের জমে থাকা অনিয়ম দূর করতে শ্বেতপত্র প্রকাশের উদ্যোগটি নিঃসন্দেহে প্রশংসনীয়। তবে কেবল দুর্নীতির তালিকা প্রকাশ করলেই হবে না, বরং দোষীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির আওতায় আনা এবং শিক্ষক-কর্মচারীদের অবসরকালীন ভাতার দীর্ঘসূত্রতা চিরতরে বন্ধ করা জরুরি। শিক্ষা যদি জাতির মেরুদণ্ড হয়, তবে সেই মেরুদণ্ডকে দুর্নীতির ক্ষয়রোগ থেকে মুক্ত রাখা সরকারের প্রধান দায়িত্ব হওয়া উচিত।