জুলাই গণঅভ্যুত্থানে পুলিশের গুলিতে নিহত এবং পরবর্তীতে লাশ গুমের শিকার হওয়া শহীদ হৃদয়ের নিঃস্ব পরিবারের পাশে দাঁড়িয়েছে ‘সাধারণ আলেম সমাজ’ নামক একটি সংগঠন। জীবিকা নির্বাহের অবলম্বন হিসেবে মঙ্গলবার সংগঠনটির পক্ষ থেকে হৃদয়ের বৃদ্ধ বাবার হাতে একটি নতুন অটোরিকশা তুলে দেওয়া হয়।
২০২৪ সালের ৫ আগস্ট ঢাকার কোনাবাড়ি এলাকায় গণআন্দোলন চলাকালে পুলিশের গুলিতে প্রাণ হারান তরুণ হৃদয়। নিষ্ঠুরতার চরম সীমায় পৌঁছে পুলিশ তার মরদেহ টেনে নিয়ে তুরাগ নদীতে ফেলে দেয়, যার ভিডিও পরবর্তী সময়ে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে শিউরে দিয়েছিল পুরো দেশকে। একমাত্র ছেলের শেষ জানাজাটুকু করার সুযোগও পায়নি তার অভাগা বাবা-মা। দীর্ঘ সময় পার হলেও হৃদয়ের মরদেহ আর খুঁজে পাওয়া যায়নি। এমনকি ২০২৫ সালের জুলাই মাসে সরকারের পক্ষ থেকে তুরাগ নদীতে বিশেষ তল্লাশি অভিযান চালানো হলেও তার মরদেহের কোনো হদিস মেলেনি।
শহীদ হৃদয়ের পরিবারের বর্তমান অবস্থা অত্যন্ত শোচনীয়। তিন ভাই-বোনের মধ্যে হৃদয় ছিলেন পরিবারের বড় আশা। ছেলের পড়াশোনা এবং দুই মেয়ের বিয়ে দিতে গিয়ে পরিবারটি প্রায় পাঁচ লাখ টাকা ঋণের জালে জড়িয়ে পড়েছে। পাওনাদাররা কড়া হুঁশিয়ারি দিয়ে জানিয়েছেন, আগামী দুই মাসের মধ্যে টাকা পরিশোধ করতে না পারলে তাদের শেষ সম্বল ভিটেমাটি ছেড়ে দিতে হবে। ছেলে হারানোর শোকের পাশাপাশি এখন মাথা গোঁজার ঠাঁই হারানোর আতঙ্কে দিন কাটছে এই বৃদ্ধ দম্পতির।
দুঃখজনক বিষয় হলো, এত বড় আত্মত্যাগের পরও হৃদয় এখনো পাননি রাষ্ট্রীয় শহীদের স্বীকৃতি। গেজেট (সরকারি প্রজ্ঞাপন) না হওয়ায় কোনো আর্থিক অনুদানও পৌঁছায়নি তাদের দুয়ারে। এই চরম দুঃসময়ে তাদের পাশে দাঁড়িয়েছে সাধারণ আলেম সমাজ। সংগঠনটির জুলাই গণঅভ্যুত্থান সেলের (শাখা বা বিভাগ) সম্পাদক আকিফ আব্দুল্লাহ সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে অটোরিকশা হস্তান্তরের বিষয়টি নিশ্চিত করেন।
তিনি জানান, হৃদয়ের পরিবার কোনো সরকারি সাহায্য না পাওয়ায় নিদারুণ কষ্টের মধ্যে দিন পার করছিল। তাদের স্থায়ী আয়ের পথ করে দিতেই এই নতুন অটোরিকশাটি প্রদান করা হয়েছে। এটি একবার বৈদ্যুতিক চার্জে প্রায় ১৪০ থেকে ১৫০ কিলোমিটার চলতে সক্ষম। এর মাধ্যমে প্রতিদিন গড়ে হাজার টাকার বেশি আয় করা সম্ভব হবে, যা দিয়ে পরিবারটি তাদের ঋণের বোঝা হালকা করার পাশাপাশি দৈনন্দিন খরচ মেটাতে পারবে। সংগঠনটির পক্ষ থেকে আশা প্রকাশ করা হয়েছে যে, এই সামান্য সহায়তা তাদের জীবনযুদ্ধকে কিছুটা সহজ করবে।
জুলাই অভ্যুত্থানে যারা প্রাণ দিয়েছেন, তাদের প্রতিটি পরিবারই আমাদের জাতীয় বীর। হৃদয়ের মতো অনেক শহীদ আজও রাষ্ট্রীয় গেজেট বা স্বীকৃতির অপেক্ষায় আছেন, যা অত্যন্ত বেদনাদায়ক। বেসরকারি পর্যায় থেকে আলেম সমাজের এই উদ্যোগ প্রশংসনীয় হলেও, শহীদ পরিবারের ঋণের বোঝা মেটানো এবং তাদের স্থায়ী পুনর্বাসনে রাষ্ট্রের দ্রুত হস্তক্ষেপ প্রয়োজন। একটি পরিবার যেন শহীদের রক্তের বিনিময়ে পাওয়া স্বাধীন দেশে ভিটেমাটি হারিয়ে নিঃস্ব না হয়, সেটি নিশ্চিত করা আমাদের সবার নৈতিক দায়িত্ব।