দীর্ঘ ১৬ বছরের বিরতি কাটিয়ে অবশেষে দেশে আবারও শুরু হয়েছে প্রাথমিক বৃত্তি পরীক্ষা। তবে ষষ্ঠ শ্রেণিতে চার মাস পড়াশোনা করার পর হঠাৎ পঞ্চম শ্রেণির এই পরীক্ষায় বসতে হওয়ায় শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের মধ্যে স্বস্তির চেয়ে উদ্বেগ ও উৎকণ্ঠাই বেশি দেখা দিয়েছে।
দেশের প্রাথমিক শিক্ষা ব্যবস্থায় এক সময়ের অতি পরিচিত ‘বৃত্তি পরীক্ষা’ দীর্ঘ দেড় দশক পর পুনরায় রাজপথে ফিরেছে। সর্বশেষ ২০০৮ সালে এই পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হয়েছিল, যার পর প্রাথমিক শিক্ষা সমাপনী (পিইসি) পরীক্ষা চালু হওয়ায় আলাদাভাবে বৃত্তি দেওয়ার প্রথাটি বন্ধ হয়ে যায়। বর্তমান সরকারের উদ্যোগে ২০২৫ সাল থেকে এটি পুনরায় শুরু হওয়ার কথা থাকলেও আইনি জটিলতায় কিছুটা বিলম্বিত হয়ে গতকাল বুধবার থেকে সারা দেশে এই পরীক্ষা শুরু হয়েছে।
রাজধানীসহ দেশের ৬১টি জেলায় গতকাল সকাল ১০টায় বাংলা বিষয়ের মাধ্যমে এই মেধা যাচাই লড়াইয়ের সূচনা হয়। আড়াই ঘণ্টার এই পরীক্ষা নিয়ে প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের পক্ষ থেকে ব্যাপক প্রস্তুতির কথা জানানো হলেও খোদ পরীক্ষার্থী ও তাদের মা-বাবার কণ্ঠে ঝরছে ভিন্ন সুর। অনেক অভিভাবক অভিযোগ করেছেন, শিক্ষার্থীরা এখন ষষ্ঠ শ্রেণিতে পড়ছে। নতুন শ্রেণির পাঠ্যবই এবং নতুন পাঠসূচির (সিলেবাস) চাপে তারা যখন হিমশিম খাচ্ছে, তখন প্রায় চার মাস আগে ফেলে আসা পঞ্চম শ্রেণির বইগুলো নিয়ে পুনরায় পরীক্ষায় বসা তাদের জন্য এক বড় মানসিক বোঝা হয়ে দাঁড়িয়েছে। অনেকের কাছেই এখন পঞ্চম শ্রেণির পুরনো বই বা নোটখাতা অবশিষ্ট নেই, ফলে প্রস্তুতির ক্ষেত্রে তাদের চরম বিড়ম্বনায় পড়তে হয়েছে।
বিশেষ করে, ষষ্ঠ শ্রেণির প্রথম সাময়িক পরীক্ষা (বছরের প্রথম বড় পরীক্ষা) যখন দোরগোড়ায়, তখন এই বৃত্তি পরীক্ষার আয়োজন শিশুদের ওপর বাড়তি চাপ সৃষ্টি করেছে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। তবে অধিদপ্তরের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, এ বছর পঞ্চম শ্রেণির মোট শিক্ষার্থীর সর্বোচ্চ ৪০ শতাংশ এই পরীক্ষায় অংশ নেওয়ার সুযোগ পাচ্ছে। এবারের বৃত্তি দেওয়া হবে দুটি বিভাগে— মেধাবৃত্তি (ট্যালেন্টপুল) এবং সাধারণ বৃত্তি। এক্ষেত্রে লিঙ্গ সমতা রক্ষায় ছাত্র ও ছাত্রীদের সমান হারে (৫০ শতাংশ করে) নির্বাচিত করা হবে। মোট বৃত্তির একটি বড় অংশ অর্থাৎ ৮০ শতাংশ সরকারি বিদ্যালয়ের জন্য এবং বাকি ২০ শতাংশ বেসরকারি বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের জন্য বরাদ্দ রাখা হয়েছে।
ভৌগোলিক কারণে তিন পার্বত্য জেলা রাঙামাটি, খাগড়াছড়ি ও বান্দরবানে এই পরীক্ষার সময়সূচিতে কিছুটা পরিবর্তন আনা হয়েছে। সেখানে শুক্রবার থেকে পরীক্ষা শুরু হওয়ার কথা রয়েছে। এদিকে রাজধানীর একটি পরীক্ষাকেন্দ্র পরিদর্শনকালে প্রাথমিক ও গণশিক্ষা প্রতিমন্ত্রী ববি হাজ্জাজ এক গুরুত্বপূর্ণ তথ্য দিয়েছেন। তিনি জানান, বৃত্তির বর্তমান নীতিমালা সংস্কারের কাজ চলছে। বৃত্তির অর্থের পরিমাণ বাড়ানো, কতজন শিক্ষার্থী এই সুবিধা পাবে তার সংখ্যা নির্ধারণ এবং বেসরকারি খাতের শিক্ষার্থীদের জন্য বরাদ্দের বিষয়টি নতুন করে সাজানো হচ্ছে। অভিভাবকদের মতামতকে গুরুত্ব দিয়ে ভবিষ্যতে এই ব্যবস্থাকে আরও আধুনিক ও শিক্ষার্থীবান্ধব করার পরিকল্পনা রয়েছে সরকারের।
দীর্ঘ ১৬ বছর পর বৃত্তি পরীক্ষা ফিরে আসা মেধা বিকাশের জন্য ইতিবাচক হলেও এর সময়জ্ঞান নিয়ে প্রশ্ন ওঠা স্বাভাবিক। বছরের মাঝপথে এসে পেছনের ক্লাসের পরীক্ষা নেওয়া শিক্ষার্থীদের মনস্তাত্ত্বিক বিকাশে কতটা সহায়ক হবে, তা ভেবে দেখার অবকাশ রয়েছে। শিক্ষাপঞ্জি বা ক্যালেন্ডারের সাথে সামঞ্জস্য রেখে ডিসেম্বরের মধ্যেই এই জাতীয় পরীক্ষাগুলো শেষ করা গেলে শিশুদের ওপর থেকে অনাবশ্যক মানসিক চাপ অনেকটাই কমিয়ে আনা সম্ভব।