বিশ্বশান্তি রক্ষায় বাংলাদেশের মুকুটে যুক্ত হলো নতুন এক গৌরবোজ্জ্বল পালক। সাইপ্রাসে নিয়োজিত জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা বাহিনীর সামরিক প্রধান বা ফোর্স কমান্ডার হিসেবে নিয়োগ পেয়েছেন বাংলাদেশের লেফটেন্যান্ট জেনারেল মোহাম্মদ আসাদুল্লাহ মিনহাজুল আলম।
জাতিসংঘের সদর দপ্তর থেকে গতকাল বুধবার এক বিশেষ বিবৃতিতে এই গুরুত্বপূর্ণ নিয়োগের বিষয়টি আনুষ্ঠানিকভাবে নিশ্চিত করা হয়েছে। জাতিসংঘ মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেস দীর্ঘ যাচাই-বাছাই শেষে বাংলাদেশের এই কৃতি সেনা কর্মকর্তাকে সাইপ্রাসের শান্তি রক্ষার গুরুদায়িত্ব অর্পণ করেছেন। তিনি মঙ্গোলিয়ার বিদায়ী মেজর জেনারেল এরদেনেবাত বাতসুরির স্থলাভিষিক্ত হবেন।
লেফটেন্যান্ট জেনারেল মিনহাজুল আলমের এই অর্জন কেবল তার ব্যক্তিগত সাফল্য নয়, বরং আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর পেশাদারিত্ব ও বিশ্বস্ততার এক অনন্য স্বীকৃতি। দীর্ঘ তিন দশকেরও বেশি সময় ধরে তিনি অত্যন্ত দক্ষতার সাথে দেশসেবা করে আসছেন। এই নতুন দায়িত্বে নিযুক্ত হওয়ার ঠিক আগ মুহূর্ত পর্যন্ত তিনি সেনাবাহিনীর প্রশিক্ষণ ও মতবাদ কমান্ডের (আর্মি ট্রেনিং অ্যান্ড ডকট্রিন কমান্ড) প্রধান হিসেবে কর্মরত ছিলেন।
সেনাবাহিনীতে তার কর্মজীবন অত্যন্ত বর্ণাঢ্য। এর আগে তিনি কক্সবাজারের ১০ পদাতিক ডিভিশনের অধিনায়ক (জিওসি) এবং এরিয়া কমান্ডার হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। এছাড়া সামরিক কর্মকর্তাদের উচ্চতর প্রশিক্ষণ কেন্দ্র ‘ডিফেন্স সার্ভিসেস কমান্ড অ্যান্ড স্টাফ কলেজে’র কমান্ড্যান্ট বা প্রধান হিসেবেও তার সফল পদচারণা ছিল।
আন্তর্জাতিক অঙ্গনেও লেফটেন্যান্ট জেনারেল মিনহাজুল আলমের অভিজ্ঞতা বেশ সমৃদ্ধ। তিনি ২০২০ থেকে ২০২১ সালে মধ্য আফ্রিকান প্রজাতন্ত্রে (সেন্ট্রাল আফ্রিকান রিপাবলিক) জাতিসংঘ মিশনে একটি খণ্ড বা সেক্টরের প্রধান হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। এছাড়াও গত শতাব্দীর শেষভাগে ১৯৯৯ থেকে ২০০০ সালে তিনি পূর্ব তিমুরে সামরিক পর্যবেক্ষক হিসেবে কাজ করে আন্তর্জাতিক শান্তি রক্ষায় ভূমিকা রেখেছিলেন।
কর্মক্ষেত্রের পাশাপাশি তার শিক্ষাগত জীবনও সমানভাবে ঈর্ষণীয়। তিনি জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় থেকে আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিষয়ে ডক্টরেট (পিএইচডি) ডিগ্রি অর্জন করেছেন। জাতীয় নিরাপত্তা এবং কৌশলগত বিষয়েও রয়েছে তার উচ্চতর ডিগ্রি। এছাড়া জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় থেকে প্রতিরক্ষা শিক্ষা এবং একটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ব্যবসায় প্রশাসনে স্নাতকোত্তর সম্পন্ন করেছেন তিনি। বহুমুখী মেধা ও অভিজ্ঞতার এই সমন্বয় সাইপ্রাসের মতো জটিল ভূ-রাজনৈতিক অঞ্চলে শান্তি বজায় রাখতে সহায়ক হবে বলে আশা করা হচ্ছে।
নীল হেলমেট পরে বিশ্বশান্তি প্রতিষ্ঠায় বাংলাদেশি শান্তি রক্ষীদের বীরত্ব ও ত্যাগ দীর্ঘদিনের। একজন বাংলাদেশি জেনারেলের হাতে একটি দেশের সম্পূর্ণ ফোর্স বা বাহিনীর কমান্ড ন্যস্ত হওয়া আমাদের দেশের কূটনৈতিক ও সামরিক শক্তির বিশাল জয়। এটি প্রমাণ করে যে, বিশ্বসংস্থা আজও বাংলাদেশের সততা ও সাহসিকতার ওপর অটল আস্থা রাখে। এই ধারাবাহিকতা আমাদের আন্তর্জাতিক মর্যাদা যেমন বাড়াবে, তেমনি নতুন প্রজন্মের সেনা কর্মকর্তাদের অনুপ্রাণিত করবে।