দীর্ঘ এক দশক আগের এক নৃশংস হত্যাকাণ্ডের ঘটনার রায় ঘোষণা করেছেন আদালত। ঢাকার আশুলিয়ায় পোশাক কর্মী স্ত্রীকে গলা কেটে হত্যার অপরাধে স্বামী রেজাউল করিম মাদবরকে মৃত্যুদণ্ড দিয়েছেন আদালত। বৃহস্পতিবার এ রায় ঘোষণা করা হয়।
ঢাকার সপ্তম অতিরিক্ত দায়রা জজ আদালতের বিচারক মো. আব্দুল্লাহ আল মাসুদ চাঞ্চল্যকর এই হত্যা মামলার রায় প্রদান করেন। রায়ে দণ্ডপ্রাপ্ত আসামিকে মৃত্যুদণ্ডের পাশাপাশি দশ হাজার টাকা অর্থদণ্ডে দণ্ডিত করা হয়েছে। মামলার রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী জিয়াউল হক জিয়া গণমাধ্যমকে জানান, রায় ঘোষণার সময় আসামি পলাতক ছিল। আদালত তার বিরুদ্ধে সাজা পরোয়ানাসহ গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করেছেন।
মামলার নথিপত্র থেকে জানা যায়, ঘটনার সময় দম্পতিটি আশুলিয়ার জিরাবো এলাকায় বসবাস করতেন। তাদের সংসারে আট বছর বয়সী এক কন্যা সন্তান ছিল। সিমা আক্তার স্থানীয় একটি পোশাক কারখানায় কাজ করে সংসার চালাতেন। কিন্তু স্বামী রেজাউল করিম কর্মহীন থাকায় প্রায়ই তাদের মধ্যে অশান্তি লেগেই থাকত। কর্মহীন স্বামী সংসারে কোনো অবদান না রাখলেও স্ত্রী সিমা কাজের তাগিদ দিলে তাকে নিয়মিত শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন করতেন রেজাউল।
এমনই এক কলহের জেরে ২০১৬ সালের ২৪ এপ্রিল ভোরে নির্মমভাবে হত্যা করা হয় সিমা আক্তারকে। ঘটনার দিন ধারালো অস্ত্র দিয়ে স্ত্রীর মাথায় আঘাত করার পর গলা কেটে তাকে হত্যা করে রেজাউল। পালানোর চেষ্টা করার সময় বাড়ির মালিক তাকে হাতেনাতে ধরে ফেলেন এবং পরে পুলিশের কাছে সোপর্দ করেন। এই ঘটনার পরপরই সিমার বাবা জাহিদুল ইসলাম আশুলিয়া থানায় একটি হত্যা মামলা দায়ের করেন।
তদন্ত পর্যায়ে আসামি রেজাউল আদালতে নিজের দায় স্বীকার করে জবানবন্দি দেয়। আশুলিয়া থানার তৎকালীন উপ-পরিদর্শক ওমর ফারুক তদন্ত শেষে ওই বছরের ৩১ আগস্ট আদালতে অভিযোগপত্র দাখিল করেন। দীর্ঘ বিচারিক প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে ২০১৭ সালের ১১ জানুয়ারি আসামির বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠনের মাধ্যমে বিচারকাজ শুরু হয়। দীর্ঘ শুনানিতে আদালত ১২ জন সাক্ষীর সাক্ষ্য গ্রহণ করেন। মামলার বিচার চলাকালীন আসামি জামিন নিয়ে পালিয়ে যাওয়ায় আত্মপক্ষ সমর্থন বা যুক্তিতর্ক উপস্থাপনের সুযোগ সে পায়নি। সবশেষে দীর্ঘ প্রতীক্ষার অবসান ঘটিয়ে আদালত আজ এই রায় ঘোষণা করলেন।
একটি সংসারের স্বপ্ন এভাবে ভেঙে যাওয়া কেবল আইনি লড়াই নয়, বরং আমাদের সামাজিক অস্থিরতার এক করুণ চিত্র। দাম্পত্য কলহ যে কতটা ভয়াবহ পরিণতির দিকে নিয়ে যেতে পারে, এই ঘটনা তার একটি জ্বলন্ত উদাহরণ। যদিও আদালত ন্যায়বিচার নিশ্চিত করেছেন, কিন্তু একজন মায়ের মৃত্যুতে আট বছর বয়সী সেই কন্যা সন্তানের জীবনের অপূরণীয় ক্ষতি কি কখনো পূরণ হবে? আমাদের সমাজে পারিবারিক সহিংসতা রোধে কেবল আইন নয়, বরং মানসিক সচেতনতা ও সামাজিক দায়বদ্ধতা এখন সময়ের দাবি।