গাজীপুরে দুই সন্তান নিয়ে স্বামীর কবরের পাশে এক নারীর বসে থাকার দৃশ্য সম্প্রতি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দিয়েছে। স্বামীর প্রতি ভালোবাসা নাকি শ্বশুরবাড়ির অবহেলার প্রতিবাদ—এমন নানা প্রশ্নে যখন নেটদুনিয়া উত্তাল, তখন সরেজমিনে উঠে এসেছে এক ভিন্নতর ও জটিল সমীকরণ।
ঘটনার সূত্রপাত গাজীপুরের এক নিভৃত পল্লীতে। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া একটি ভিডিওতে দেখা যায়, ছোট দুই সন্তান ও বিছানাপত্র নিয়ে স্বামীর কবরের পাশে দিনাতিপাত করছেন সোনিয়া বেগম নামের এক নারী। ভিডিওটি ভাইরাল হওয়ার পর জনমনে ব্যাপক সহানুভূতির সৃষ্টি হয়। তবে বৃহস্পতিবার সরেজমিনে এলাকাটি পরিদর্শন করে দেখা গেছে ভিন্ন চিত্র। দিনের অনেকটা সময় কবরের পাশে কাউকে দেখা না গেলেও, ভিডিও ধারণকারী বা ‘কনটেন্ট ক্রিয়েটর’দের উপস্থিতি টের পেলেই সোনিয়া তার সন্তানদের নিয়ে ঘর থেকে বেরিয়ে কবরের পাশে গিয়ে বসছেন।
সোনিয়া বেগমের দাবি, প্রায় দশ বছর আগে সুজন মাহমুদের সাথে তার বিয়ে হয়। দাম্পত্য জীবনের শুরু থেকেই পারিবারিক কলহ ছিল নিত্যসঙ্গী। তার অভিযোগ, স্বামী সুজন মাহমুদ যখন গুরুতর অসুস্থ হয়ে পড়েন, তখন সচ্ছল হওয়া সত্ত্বেও শ্বশুর কফিল উদ্দিন ও শাশুড়ি কোনো চিকিৎসার ব্যয়ভার বহন করেননি। এমনকি স্বামীর অকাল মৃত্যুর পর এখন তাকে দুই সন্তানসহ বাড়িতে আশ্রয় দিতেও অস্বীকার করছেন তারা।
তবে মুদ্রার উল্টো পিঠ বলছে অন্য কথা। স্থানীয় বাসিন্দাদের মতে, এই সংকটের মূলে রয়েছে মূলত সম্পত্তির ভাগাভাগি ও পারিবারিক বিরোধ। সোনিয়ার শ্বশুর কফিল উদ্দিন ইতিপূর্বেই সংবাদ সম্মেলন করে পাল্টা অভিযোগ তুলেছেন। তার দাবি, সোনিয়ার অবহেলার কারণেই তার ছেলের সঠিক চিকিৎসা হয়নি এবং অকাল মৃত্যু ঘটেছে। সম্পত্তির অধিকার বিষয়ে তিনি জানান, তার ছেলে আইনগতভাবেই সম্পত্তির অংশীদার এবং তিনি তা দিতেও ইচ্ছুক। কিন্তু স্থানীয় কিছু স্বার্থান্বেষী মহলের ইন্ধনে বিষয়টি জটিল রূপ নিয়েছে।
তদন্তে আরও জানা যায়, মৃত সুজন মাহমুদের নিজস্ব একটি ঘর থাকা সত্ত্বেও সোনিয়া বর্তমানে অন্য একটি বাড়িতে অবস্থান করছেন। সুজনের পৈতৃক বাড়িতে গিয়ে দেখা যায় সেখানে তালা ঝুলছে। প্রতিবেশীরা জানিয়েছেন, বিয়ের পর থেকেই কলহের জেরে এই দম্পতি আলাদা সংসার করতেন। তবে বর্তমানে ওই বাড়িতে কারা তালা দিয়েছে, সে বিষয়ে কেউ স্পষ্ট করে কিছু বলতে পারেননি।
সবচেয়ে চাঞ্চল্যকর বিষয় হলো, বিষয়টি যখন প্রশাসনিক বা গণমাধ্যমের নজরে জোরালোভাবে আসতে শুরু করেছে, তখন থেকেই সোনিয়া বেগম রহস্যজনকভাবে আত্মগোপন করেছেন। বৃহস্পতিবার দিনভর চেষ্টা করেও তার কোনো সন্ধান পাওয়া যায়নি। স্থানীয়দের অভিযোগ, সামাজিক মাধ্যমে সহানুভূতি আদায়ের লক্ষ্যে বিষয়টিকে অতিরঞ্জিতভাবে উপস্থাপন করা হচ্ছে, যা প্রকৃত সত্যকে আড়াল করছে।
ডিজিটাল যুগে এসে মানুষের আবেগ এখন অনেকটাই ‘ভাইরাল’ সংস্কৃতির হাতে বন্দী। গাজীপুরের এই ঘটনাটি আমাদের চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেয় যে, পর্দার পেছনের সত্য অনেক সময় ভিডিওর ফ্রেমের চেয়েও জটিল হয়। পারিবারিক বিরোধ ও সম্পত্তির লড়াই যখন শিশুদের ব্যবহার করে সামাজিক মাধ্যমে উপস্থাপিত হয়, তখন ন্যায়বিচার পাওয়া আরও কঠিন হয়ে পড়ে। সহানুভূতি যেন প্রকৃত সত্যকে ছাপিয়ে না যায়, সেদিকে আমাদের সজাগ থাকা প্রয়োজন।