সারা দেশে যখন জ্বালানি তেলের জন্য হাহাকার আর পেট্রোল পাম্পগুলোতে অন্তহীন অপেক্ষা, তখন সিরাজগঞ্জে দেখা যাচ্ছে সম্পূর্ণ ভিন্ন এক সুশৃঙ্খল চিত্র। জেলা প্রশাসনের প্রবর্তিত ‘জ্বালানি কার্ড’ (বিশেষ পরিচয়পত্র) ব্যবস্থার মাধ্যমে পাম্পের বিশৃঙ্খলা দূর হওয়ার পাশাপাশি উধাও হয়েছে অবৈধ যানবাহনের দাপট।
বৈশ্বিক অস্থিরতার প্রভাবে দেশজুড়ে জ্বালানি সংকট এক প্রকট রূপ নিয়েছে। অধিকাংশ জেলায় তেলের জন্য মাইলের পর মাইল দীর্ঘ লাইন আর চালকদের মধ্যে ক্ষোভ দেখা দিলেও সিরাজগঞ্জের চিত্র এখন স্বস্তিদায়ক। এখানে তেলের জন্য নেই কোনো ধাক্কাধাক্কি বা ঘণ্টার পর ঘণ্টা অনিশ্চিত অপেক্ষা। এই আমূল পরিবর্তনের নেপথ্যে রয়েছে জেলা প্রশাসনের নেওয়া একটি সময়োপযোগী ও অভিনব উদ্যোগ— ‘জ্বালানি কার্ড’।
চলতি মাসের শুরু থেকেই সিরাজগঞ্জ জেলা ও এর বিভিন্ন উপজেলায় বৈধ কাগজপত্র যাচাই-বাছাই করে এই বিশেষ কার্ড দেওয়া শুরু হয়। জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে পরিষ্কার জানিয়ে দেওয়া হয়েছে, ‘কার্ড নেই তো তেলও নেই’। এই নীতির ফলে পাম্পগুলোতে যেমন শৃঙ্খলা ফিরেছে, তেমনি লাইসেন্সবিহীন বা অবৈধ যানবাহনের ভিড়ও উল্লেখযোগ্য হারে কমেছে। মূলত গাড়ির বৈধ নিবন্ধিত কাগজ এবং চালকের যথাযথ চালনা অনুমতিপত্র (ড্রাইভিং লাইসেন্স) থাকলেই কেবল এই কার্ড মিলছে।
স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, জাতীয় পরিচয়পত্র ও প্রয়োজনীয় কাগজপত্র নিয়ে জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ে গেলেই মিলছে এই কার্ড। একবার কার্ড হাতে পেলে পাম্পে গিয়ে আর আগের মতো ভোগান্তিতে পড়তে হচ্ছে না। সাধারণ মোটরবাইক চালকদের মতে, কার্ড পদ্ধতি চালু হওয়ায় একদিকে যেমন তেলের সুষম বণ্টন নিশ্চিত হচ্ছে, অন্যদিকে সড়কে অবৈধ যানের দাপট কমে যাওয়ায় নিরাপত্তা বেড়েছে।
এই পদ্ধতির অন্যতম বৈশিষ্ট্য হলো, কার্ডের মধ্যেই উল্লেখ থাকছে তেল নেওয়ার নির্ধারিত তারিখ এবং বরাদ্দের পরিমাণ। এর ফলে সব গাড়ি একই সময়ে পাম্পে ভিড় জমাচ্ছে না। পাম্পগুলোতে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে বিশেষ তদারকি কর্মকর্তা (ট্যাগ অফিসার)। সিরাজগঞ্জ পার্ক ফিলিং স্টেশনে দায়িত্বরত তদারকি কর্মকর্তা মো. শামীম হোসেন জানান, তারা শতভাগ কার্ড যাচাই করে তেল দিচ্ছেন। যার কার্ড নেই বা গাড়ির ট্যাংকে পর্যাপ্ত তেল মজুত আছে, তাকে নতুন করে তেল দিয়ে অপচয় রোধ করা হচ্ছে।
সিরাজগঞ্জ জেলা প্রশাসনের দেওয়া সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, এখন পর্যন্ত জেলায় ১৬ হাজার ১৬৩টি জ্বালানি কার্ড বিতরণ করা হয়েছে। জেলা প্রশাসক মো. আমিনুল ইসলাম জানিয়েছেন, এই প্রক্রিয়া চলমান থাকবে এবং জেলায় প্রায় ২০ থেকে ২৫ হাজার বৈধ যানবাহন এই কার্ডের আওতায় আসবে। অযথা ভিড় এবং অবৈধ যানবাহনের দৌরাত্ম্য কমে যাওয়ায় সাধারণ গ্রাহকদের মধ্যে স্বস্তি ফিরে এসেছে। সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, বর্তমান সংকটকালীন সময়ে সিরাজগঞ্জের এই ‘জ্বালানি কার্ড’ পদ্ধতি সারা দেশের জন্য একটি অনুকরণীয় মডেল হতে পারে।
সিরাজগঞ্জের এই উদ্যোগ প্রমাণ করে যে, সীমিত সম্পদের সঠিক ব্যবস্থাপনা ও সদিচ্ছা থাকলে যেকোনো বড় সংকটকেও নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব। প্রযুক্তি ও নিয়মের সমন্বয় ঘটিয়ে কীভাবে কালোবাজারি রোধ করা যায় এবং সাধারণ মানুষের ভোগান্তি কমানো যায়, তার একটি উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত এই ‘জ্বালানি কার্ড’। তবে এই সফলতাকে টেকসই করতে হলে নিয়মিত তদারকি প্রয়োজন। দেশের অন্যান্য বড় শহরগুলোতেও যদি এই মডেল প্রয়োগ করা যায়, তবে জ্বালানি তেলের বাজারে চলমান নৈরাজ্য অনেকটাই কমে আসবে বলে আশা করা যায়।