উপমহাদেশের সঙ্গীত জগতের এক অপূরণীয় ক্ষতি হয়ে গেল। চিরবিদায় নিলেন সুরের জাদুকরী আশা ভোঁসলে। তাঁর প্রয়াণে শুধু ভারত নয়, সমগ্র বিশ্বের সঙ্গীতানুরাগীদের মাঝে নেমে এসেছে গভীর শোকের ছায়া। বিশেষ করে বাংলাদেশের কিংবদন্তি শিল্পী রুনা লায়লা তাঁর প্রিয় ‘আশা দিদি’র মৃত্যুতে ভেঙে পড়েছেন, যেন হারিয়েছেন নিজের ছায়াকে।
উপমহাদেশের সঙ্গীতের ইতিহাসে এক অবিস্মরণীয় নাম আশা ভোঁসলে। রবিবার দুপুর ১২টায় মুম্বাইয়ের ব্রিচ ক্যান্ডি হাসপাতালে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন এই কিংবদন্তি শিল্পী। মৃত্যুকালে তাঁর বয়স হয়েছিল ৯২ বছর। জানা গেছে, হৃদরোগ ও শ্বাসকষ্টজনিত জটিলতা নিয়ে আগের দিনই তাঁকে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছিল। চিকিৎসকদের আপ্রাণ চেষ্টা সত্ত্বেও ফেরানো যায়নি এই সুরসম্রাজ্ঞীকে।
আশা ভোঁসলের চিরবিদায়ে বাংলাদেশের সঙ্গীত জগতের অহংকার রুনা লায়লা অত্যন্ত আবেগপ্রবণ হয়ে পড়েছেন। সংবাদটি পাওয়ার পর তিনি নিজেকে সামলাতে পারছিলেন না। রুনা লায়লা বলেন, "মনে হচ্ছে আমার পৃথিবীটাই আজ হঠাৎ শূন্য হয়ে গেল। লতা মুঙ্গেশকর দিদি চলে যাওয়ার পর আশা দিদিই ছিলেন আমার বড় আশ্রয়। তাঁরা দুজনেই আমাকে মায়ের মতো স্নেহ করতেন। এমন মহান শিল্পী এই পৃথিবীতে আর দ্বিতীয়টি আসবে না।"
ব্যক্তিগত স্মৃতির কথা স্মরণ করে রুনা লায়লা জানান, তাঁদের মধ্যকার সম্পর্ক ছিল অত্যন্ত নিবিড়। রুনা লায়লার নিজের সুর করা গান ‘চলে যাওয়া ঢেউগুলো আর ফিরে আসেনি’-এর রেকর্ডিংয়ের সময় তাঁদের শেষ দেখা হয়েছিল। পেশাগত সম্পর্কের বাইরেও তাঁদের মধ্যে ছিল নিয়মিত যোগাযোগ। তবে শেষ দিকে দিদির সঙ্গে কথা না বলতে পারার আক্ষেপ তাঁকে পুড়িয়ে মারছে।
রুনা লায়লার কণ্ঠে ঝরে পড়ছিল গভীর বেদনা। তিনি আক্ষেপ করে বলেন, "বেশ কিছুদিন ধরে ভাবছিলাম দিদির সঙ্গে ফোনে কথা বলব। আজ করব, কাল করব করে আর বলা হলো না। এই আফসোসটা আমাকে সারাজীবন বয়ে বেড়াতে হবে। যদি তখনই ফোনটা করতাম, তবে শেষবারের মতো তাঁর কণ্ঠটা শুনতে পেতাম।"
আশা ভোঁসলে দীর্ঘ কয়েক দশক ধরে হিন্দি চলচ্চিত্র ছাড়াও বিভিন্ন ভাষায় কয়েক হাজার গান গেয়েছেন। তাঁর বৈচিত্র্যময় কণ্ঠ আর গায়কী শৈলী তাঁকে অনন্য উচ্চতায় নিয়ে গিয়েছিল। লতা মুঙ্গেশকর এবং আশা ভোঁসলে—এই দুই বোনের প্রয়াণে উপমহাদেশের ধ্রুপদী ও আধুনিক সঙ্গীতের একটি সোনালী অধ্যায়ের পুরোপুরি সমাপ্তি ঘটল।
আশা ভোঁসলের প্রয়াণ কেবল একজন ব্যক্তির মৃত্যু নয়, বরং একটি যুগের অবসান। তিনি তাঁর কণ্ঠের জাদুতে জয় করেছেন কোটি মানুষের হৃদয়। রুনা লায়লার মতো বড় শিল্পীদের এই হাহাকার প্রমাণ করে যে, প্রকৃত প্রতিভা কাঁটাতারের সীমানা মানে না। শিল্পীরা অমর তাঁদের সৃষ্টির মাধ্যমে, কিন্তু রক্ত-মাংসের মানুষ হিসেবে তাঁদের চলে যাওয়া যে শূন্যতা তৈরি করে, তা কি কখনো পূরণ হবে?