দেশের প্রশাসনিক ও বিচারিক কার্যক্রমে গতিশীলতা ফেরাতে অন্তর্বর্তী সরকারের জারিকৃত অধ্যাদেশগুলো এখন আইনি পূর্ণতা পেয়েছে। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের প্রথম অধিবেশনের দশম দিনে অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে মোট ১৪টি বিল কণ্ঠভোটে পাস করা হয়েছে।
মঙ্গলবার জাতীয় সংসদের অধিবেশনে দিনভর ব্যস্ততার মধ্য দিয়ে বিল পাসের এই মহাযজ্ঞ সম্পন্ন হয়। সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়গুলোর দায়িত্বপ্রাপ্ত মন্ত্রী ও প্রতিমন্ত্রীরা এসব বিল সংসদীয় টেবিলে উত্থাপন করেন। অধিবেশনের সকাল ও বিকাল—দুই পর্বেই বিল পাসের কার্যক্রম অব্যাহত ছিল। এদিন মোট ১৬টি বিল উত্থাপন করা হলেও শেষ পর্যন্ত ১৪টি বিল পূর্ণাঙ্গ আইনে রূপান্তরের লক্ষ্যে পাস করা হয়। বাকি দুটি বিল বর্তমানে যাচাই-বাছাই ও আইনি প্রক্রিয়ার মধ্যে রয়েছে।
বিকালের অধিবেশনে বেশ কিছু নীতি নির্ধারণী বিল পাস হয়। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো ‘নির্দিষ্টকরণ (সম্পূরক) আইন, ২০২৬’ এবং ‘নির্দিষ্টকরণ আইন, ২০২৬’। এছাড়া বিদ্যুৎ খাতের স্বচ্ছতা ফেরাতে আলোচিত ‘বিদ্যুৎ ও জ্বালানি দ্রুত সরবরাহ বৃদ্ধি (বিশেষ বিধান) রহিতকরণ (বাতিল করা) আইন, ২০২৬’ পাস করা হয়েছে। পল্লী উন্নয়নের ধারা বেগবান করতে ‘বঙ্গবন্ধু দারিদ্র্য বিমোচন ও পল্লী উন্নয়ন একাডেমি (সংশোধন) আইন’ এবং রংপুরে অবস্থিত ‘শেখ রাসেল পল্লী উন্নয়ন একাডেমি (সংশোধন) আইন’ অনুমোদিত হয়েছে। ব্যবসায়িক বিরোধ দ্রুত নিষ্পত্তির লক্ষ্যে ‘বাণিজ্যিক আদালত আইন’ পাসের বিষয়টিও ছিল অন্যতম বড় অর্জন।
অধিবেশনের প্রথম ভাগে অর্থাৎ সকালে পাস করা হয় আরও আটটি গুরুত্বপূর্ণ বিল। এর মধ্যে পরিবেশ ও প্রাণবৈচিত্র্য রক্ষায় ‘হাওর ও জলাভূমি সংরক্ষণ বিল’ এবং বিচার ব্যবস্থার সংস্কারে ‘ফৌজদারি কার্যবিধি (সংশোধন) বিল’ ও ‘দেওয়ানি আদালত (সংশোধন) বিল’ পাস হয়। বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য ছিল ‘আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল (সংশোধন) বিল’, যা ন্যায়বিচার নিশ্চিতের পথে বড় পদক্ষেপ হিসেবে দেখা হচ্ছে। এছাড়া ভূমি ব্যবস্থাপনায় শৃঙ্খলা আনতে ‘নিবন্ধন (সংশোধন) বিল’ এবং বেশ কয়েকটি চিকিৎসা বিশ্ববিদ্যালয় সংক্রান্ত সংশোধনী বিলও এই তালিকায় স্থান পেয়েছে।
অন্যদিকে, ‘জাতীয় মুক্তিযোদ্ধা কাউন্সিল (সংশোধন) আইন’ বিলটি সংসদে উত্থাপন করা হলেও এর ওপর আরও আলোচনার প্রয়োজন মনে করেছেন সংসদ সদস্যরা। পাশাপাশি জনস্বাস্থ্যের সাথে সম্পৃক্ত ‘ধূমপান ও তামাকজাত দ্রব্য ব্যবহার (নিয়ন্ত্রণ) সংশোধন বিল’ উত্থাপিত হলেও তা এখনো পাসের অপেক্ষায় রয়েছে। জানা গেছে, প্রয়োজনীয় পরিমার্জন ও সংশোধন শেষে বিলটি পুনরায় পাসের জন্য তোলা হবে।
সংসদীয় ব্যবস্থায় অধ্যাদেশকে আইনে রূপান্তর করা কেবল আইনি বাধ্যবাধকতা নয়, বরং এটি রাষ্ট্রের স্বচ্ছতা ও দায়বদ্ধতার বহিঃপ্রকাশ। অন্তর্বর্তী সরকারের এই সংস্কারমূলক পদক্ষেপগুলো এখন জনপ্রতিনিধিদের মাধ্যমে অনুমোদিত হওয়ায় সেগুলোর গ্রহণযোগ্যতা আরও সুসংহত হলো। বিশেষ করে জ্বালানি খাতের বিশেষ আইন বাতিল এবং আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের সংস্কার দীর্ঘমেয়াদে সুশাসন নিশ্চিত করবে বলে আশা করা যায়। তবে তামাক নিয়ন্ত্রণের মতো জনগুরুত্বপূর্ণ বিলগুলো যাতে আমলাতান্ত্রিক জটিলতায় আটকে না থাকে, সেদিকেও নজর রাখা জরুরি।