দেশের পরিবহন খাতে দীর্ঘদিনের অরাজকতা ও অনিয়ম বন্ধে কঠোর অবস্থান নিচ্ছে সরকার। সড়ক ও মহাসড়কে চলাচলকারী বাসের গতিবিধি এবং অবস্থান সার্বক্ষণিক পর্যবেক্ষণের জন্য এবার প্রতিটি যানবাহনে অত্যাধুনিক অবস্থান নির্ণায়ক প্রযুক্তি ব্যবহারের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
বৃহস্পতিবার (৯ এপ্রিল) জাতীয় সংসদের প্রশ্নোত্তর পর্বে গণপরিবহনে শৃঙ্খলা ফেরানোর এই নতুন পরিকল্পনার কথা জানান সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রী শেখ রবিউল আলম। স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত অধিবেশনে সংসদ সদস্য আবুল কালাম আজাদ সিদ্দিকীর এক প্রশ্নের জবাবে মন্ত্রী এ তথ্য তুলে ধরেন।
সড়ক পরিবহন মন্ত্রী জানান, বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষ (বিআরটিএ) ইতিমধ্যে সড়ক ও মহাসড়কে চলাচলকারী গণপরিবহনে গ্লোবাল পজিশনিং সিস্টেম (জিপিএস) বা কৃত্রিম উপগ্রহ ভিত্তিক অবস্থান নির্ণায়ক প্রযুক্তি (মহাকাশে থাকা উপগ্রহের সাহায্যে পৃথিবীর যেকোনো স্থানের সঠিক অবস্থান জানার ব্যবস্থা) চালুর প্রাথমিক প্রক্রিয়া শুরু করেছে। এই প্রযুক্তি ব্যবহারের ফলে কোনো বাস বর্তমানে কোথায় অবস্থান করছে এবং সেটি কত গতিতে চলছে, তা কেন্দ্রীয়ভাবে সহজেই পর্যবেক্ষণ করা সম্ভব হবে।
মন্ত্রী আশাপ্রকাশ করেন যে, এই ব্যবস্থা কার্যকর হলে চালকদের যত্রতত্র বাস থামিয়ে যাত্রী ওঠানামা করা, অসুস্থ প্রতিযোগিতায় লিপ্ত হওয়া এবং যাত্রীদের কাছ থেকে অতিরিক্ত ভাড়া আদায়ের মতো দীর্ঘদিনের অনিয়মগুলো নিয়ন্ত্রণে আসবে। এছাড়া কোনো যান নির্ধারিত গতিসীমা অতিক্রম করলে কিংবা ট্রাফিক আইন লঙ্ঘন করলে তার তথ্য স্বয়ংক্রিয়ভাবে সংরক্ষিত হবে। এর ভিত্তিতে সংশ্লিষ্ট মালিক ও চালকের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নেওয়া সহজ হবে।
অধিবেশনের অপর এক প্রশ্নের জবাবে মন্ত্রী ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানগুলোর অনিয়মের বিরুদ্ধে কঠোর হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করেন। সংসদ সদস্য হাসনাত আব্দুল্লাহর প্রশ্নের জবাবে তিনি জানান, ২০২৪ সালের শুরু থেকে এখন পর্যন্ত জালিয়াতি ও প্রতারণামূলক কাজে জড়িত থাকার প্রমাণ পাওয়ায় ৮১টি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানকে কালো তালিকাভুক্ত বা নিষিদ্ধ করা হয়েছে। এছাড়া ক্রয় প্রক্রিয়ায় দুর্নীতির অভিযোগে কয়েকজন সরকারি কর্মকর্তার বিরুদ্ধে বিভাগীয় মামলা বর্তমানে চলমান রয়েছে।
যাত্রীদের দীর্ঘদিনের অভিযোগের প্রেক্ষিতে মন্ত্রী আরও জানান, শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত (এসি) বাস ও মিনিবাসের ভাড়ার সঠিক তালিকা তৈরির কাজ দ্রুত শুরু হবে। স্বতন্ত্র সংসদ সদস্য রুমিন ফারহানার প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, কেবল ভাড়া নির্ধারণই নয়, বরং বাসের অভ্যন্তরে ডিজিটাল পর্দা বা ডিসপ্লে স্থাপনের মাধ্যমে সেই তালিকা প্রদর্শন বাধ্যতামূলক করা হবে, যাতে সাধারণ যাত্রীরা প্রতারিত না হন।
ডিজিটাল পদ্ধতিতে পরিবহন খাতকে নজরদারির আওতায় আনা নিঃসন্দেহে একটি আধুনিক ও সাহসী পদক্ষেপ। তবে অতীতে বহুবার ভাড়া নির্ধারণ বা নিয়ম জারির পরও মাঠপর্যায়ে সেগুলোর সঠিক বাস্তবায়ন দেখা যায়নি। এই অত্যাধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহারের সুফল সাধারণ মানুষ কতটুকু পাবে, তা নির্ভর করছে এর কঠোর প্রয়োগ এবং বিআরটিএ-র নিয়মিত তদারকির ওপর। একটি নিরাপদ ও আধুনিক সড়ক ব্যবস্থার জন্য প্রযুক্তির পাশাপাশি আইনের সমান প্রয়োগ অত্যন্ত জরুরি।