টানা বৃষ্টি আর উজানের পাহাড়ি ঢলের পর অবশেষে কিছুটা স্বস্তির নিশ্বাস ফেলছেন নেত্রকোনা, হবিগঞ্জ ও সুনামগঞ্জের বিস্তীর্ণ হাওরাঞ্চলের মানুষেরা। গত চব্বিশ ঘণ্টায় নতুন করে উল্লেখযোগ্য কোনো বৃষ্টিপাত না হওয়ায় লোকালয় থেকে ধীরে ধীরে নামতে শুরু করেছে বন্যার পানি। তবে আতঙ্ক এখনো পুরোপুরি কাটেনি, কারণ এই অঞ্চলের পাঁচটি প্রধান নদীর পানি এখনো নির্ধারিত বিপৎসীমার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে।
প্রকৃতির রুদ্ররোষে গত কয়েক দিন ধরেই বিপর্যস্ত ছিল দেশের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের জনজীবন। অবিরাম বর্ষণ এবং প্রতিবেশী দেশ থেকে নেমে আসা প্রবল পাহাড়ি ঢলে সুনামগঞ্জ, নেত্রকোনা এবং হবিগঞ্জ জেলার হাওর লাগোয়া নিম্নাঞ্চলগুলো দ্রুতই পানিতে তলিয়ে যায়। ঘরবাড়ি ও ফসলি জমিতে পানি ওঠায় চরম দিশেহারা হয়ে পড়েছিলেন প্রান্তিক মানুষেরা। তবে রোববারের পর থেকে প্রকৃতি কিছুটা শান্ত হতে শুরু করেছে। আকাশে মেঘের ঘনঘটা কমায় এবং নতুন করে ভারী বৃষ্টি না হওয়ায় পানি কমার লক্ষণ দেখা যাচ্ছে।
বন্যা পূর্বাভাস ও সতর্কীকরণ কেন্দ্রের নির্বাহী প্রকৌশলী মঞ্জুর রহমান বর্তমান পরিস্থিতির সার্বিক চিত্র তুলে ধরে জানিয়েছেন, আগের দিনগুলোর তুলনায় বর্তমানে বন্যা পরিস্থিতির বেশ উন্নতি হয়েছে। তিনি বলেন, গত চব্বিশ ঘণ্টায় ভারী বৃষ্টিপাত না হওয়ার কারণে ঢলের পানি নতুন করে বাড়েনি। যদিও তিন জেলার হাওর লাগোয়া নিচু এলাকাগুলো এখনো জলমগ্ন অবস্থায় রয়েছে, তবে পানি ধীরে ধীরে নামতে শুরু করেছে। এটি বন্যাদুর্গত মানুষের জন্য একটি বড় ধরনের স্বস্তির খবর।
পরিস্থিতির উন্নতি হলেও বিপদ এখনো পুরোপুরি কাটেনি। বন্যা পূর্বাভাস ও সতর্কীকরণ কেন্দ্রের সর্বশেষ প্রাত্যহিক প্রতিবেদন অনুযায়ী, রোববার (১০ মে) দেশের পাঁচটি নদীর পানি নির্দিষ্ট কয়েকটি পরিমাপক স্থানে প্রাক-মৌসুমি বিপৎসীমার (যে নির্দিষ্ট সীমার ওপরে পানি উঠলে লোকালয় প্লাবিত হওয়ার মারাত্মক ঝুঁকি থাকে) ওপর দিয়ে বইছিল। এর মধ্যে সুনামগঞ্জ জেলার নালজুর নদীর পানি জগন্নাথপুর অংশে, নেত্রকোনা জেলার ভুগাই-কংস নদীর পানি জারিয়া-জঞ্জাইল অংশে, সোমেশ্বরী নদীর পানি কলমাকান্দা অংশে এবং মগরা নদীর পানি নেত্রকোনা সদর অংশে বিপৎসীমার ওপরে অবস্থান করছে। অন্যদিকে, হবিগঞ্জ জেলার সুতাং নদীর পানি সুতাং রেলসেতু অংশে বিপৎসীমার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে।
তবে আশার কথা হলো, সামগ্রিকভাবে দেশের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের নদ-নদীগুলোর পানি কমার একটি ইতিবাচক প্রবণতা লক্ষ্য করা যাচ্ছে। সুরমা-কুশিয়ারা, ধনু-বাউলাই এবং ভুগাই-কংসের মতো বড় ও খরস্রোতা নদীগুলোর পানির স্তর গত এক দিনে বেশ কিছুটা নিচে নেমে এসেছে। পূর্বাভাস কেন্দ্রের তথ্যমতে, আগামী তিন দিন এই অঞ্চলের বেশিরভাগ নদীর পানি কমতে পারে অথবা অন্তত স্থিতিশীল থাকতে পারে। বিশেষ করে সিলেট ও সুনামগঞ্জ জেলার সুরমা ও কুশিয়ারা নদীর পানি আগামী দুই দিন কমার সম্ভাবনা রয়েছে, যার ফলে কুশিয়ারা অববাহিকার সার্বিক বন্যা পরিস্থিতির আরও উন্নতি হবে। একইভাবে নেত্রকোনার ধনু-বাউলাই ও মগরা নদী এবং হবিগঞ্জের সুতাং, মনু, খোয়াই ও জুড়ি নদীর পানিও স্থিতিশীল থাকার পূর্বাভাস দেওয়া হয়েছে।
নদীর পানি কমলেও আকাশের দিকে তাকিয়ে এখনো দুশ্চিন্তায় আছেন কৃষকেরা। বাংলাদেশ আবহাওয়া অধিদপ্তর এবং বৈশ্বিক আবহাওয়া সংস্থাগুলোর তথ্য বিশ্লেষণ করে বন্যা পূর্বাভাস কেন্দ্র জানিয়েছে, আগামী দুই দিন এই হাওর অঞ্চলে মাঝারি থেকে ভারী মাত্রার বৃষ্টিপাত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। তৃতীয় দিনের মাথায় গিয়ে বৃষ্টির তীব্রতা কিছুটা কমে আসতে পারে। এর পাশাপাশি আবহাওয়া অধিদপ্তর একটি নতুন সতর্কবার্তা দিয়েছে। তারা জানিয়েছে, ভারতের পশ্চিমবঙ্গ এবং এর আশপাশের এলাকায় বর্তমানে লঘুচাপের একটি বর্ধিতাংশ অবস্থান করছে। এর প্রভাবে সোমবারের (১১ মে) মধ্যে দক্ষিণ-পশ্চিম বঙ্গোপসাগর এবং তৎসংলগ্ন বিশাল সামুদ্রিক এলাকায় একটি নতুন লঘুচাপ সৃষ্টি হতে পারে, যা আবহাওয়াকে ফের অস্থিতিশীল করে তুলতে পারে।
হাওরাঞ্চলে প্রাক-মৌসুমি বন্যা বা পাহাড়ি ঢল নতুন কোনো ঘটনা নয়, তবে প্রতি বছরই এটি প্রান্তিক কৃষকদের জন্য এক বিশাল অর্থনৈতিক বিপর্যয় ডেকে আনে। কৃষকের ঘামে বোনা স্বপ্নের বোরো ধান ঘরে তোলার ঠিক আগমুহূর্তে এমন আকস্মিক ঢল পুরো বছরের অন্ন সংস্থানের পথ বন্ধ করে দেয়। পানি কমার বর্তমান খবরটি সাময়িক স্বস্তির হলেও, প্রকৃতির খামখেয়ালিপনার ওপর পুরোপুরি নির্ভর করে বসে থাকার সুযোগ নেই। হাওরের ফসল রক্ষা বাঁধগুলোর স্থায়ী সংস্কার, নিয়মিত তদারকি এবং কৃষকদের জন্য আগাম সতর্কবার্তার আরও আধুনিক ও দ্রুততর মাধ্যম তৈরি করা এখন সময়ের দাবি। প্রকৃতির সঙ্গে লড়াই করে হয়তো সব সময় জেতা সম্ভব নয়, তবে সঠিক পূর্বপ্রস্তুতি ও ব্যবস্থাপনা থাকলে ক্ষয়ক্ষতি অন্তত সহনশীল পর্যায়ে রাখা সম্ভব।