রাজধানীর দুই সিটি করপোরেশন এলাকায় আগামী ১২ এপ্রিল থেকে শিশুদের হাম ও রুবেলার টিকাদান কর্মসূচি শুরু হতে যাচ্ছে। সোমবার জাতীয় সংসদে এক জরুরি প্রশ্নের জবাবে স্বাস্থ্যমন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন বকুল দেশের বর্তমান হাম পরিস্থিতি মোকাবিলায় সরকারের গৃহীত এই বিশেষ পদক্ষেপের কথা জানান।
দেশে হঠাৎ করে হামের প্রাদুর্ভাব বেড়ে যাওয়ার প্রেক্ষাপটে সরকারের অবস্থান পরিষ্কার করতে জাতীয় সংসদে বিরোধীদলীয় সংসদ সদস্য আখতার হোসেনের এক নোটিশের জবাব দেন স্বাস্থ্যমন্ত্রী। তিনি জানান, গত পাঁচ বছর দেশে কোনো বড় ধরনের হাম-রুবেলা টিকাদান কর্মসূচি (ক্যাম্পেইন) না হওয়ায় এই রোগটি ছড়িয়ে পড়ার সুযোগ পেয়েছে। এজন্য তিনি বিগত সরকারগুলোর টিকাসংক্রান্ত উদাসীনতা ও অব্যবস্থাপনাকে দায়ী করেন। মন্ত্রী উল্লেখ করেন, ৫ এপ্রিল থেকেই দেশের ১৮টি উচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ স্থানে টিকাদান শুরু হয়েছে। প্রথম ধাপে ১২ লাখ শিশুকে এই টিকার আওতায় আনা হবে, যার মধ্যে ৫ এপ্রিল এক দিনেই ৭৩ হাজার শিশুকে টিকা দেওয়া হয়েছে।
পরিকল্পনা অনুযায়ী, আগামী ১২ এপ্রিল ঢাকার উত্তর ও দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের শিশুদের টিকা দেওয়া হবে এবং পরবর্তীতে পর্যায়ক্রমে সারা দেশে এই কর্মসূচি বিস্তৃত করা হবে। টিকার পাশাপাশি শিশুদের ভিটামিন-এ ক্যাপসুলও দেওয়া হচ্ছে। স্বাস্থ্যমন্ত্রী আরও জানান, বর্তমান পরিস্থিতিতে মাঠ পর্যায়ের স্বাস্থ্যকর্মীদের সব ধরনের ছুটি বাতিল করা হয়েছে। যেসব এলাকায় রোগের প্রকোপ বেশি, সেখানে আক্রান্ত শিশুদের আলাদা রেখে চিকিৎসার জন্য বিশেষ ব্যবস্থা (আইসোলেশন) করা হয়েছে। জরুরি ভিত্তিতে টিকা আমদানির প্রক্রিয়া চলছে এবং এতে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা ও বিশ্বব্যাংক সহযোগিতার আশ্বাস দিয়েছে।
সংসদে দেওয়া বক্তব্যে স্বাস্থ্যমন্ত্রী আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ তথ্য প্রকাশ করেন। তিনি জানান, করোনা মহামারির সময় অব্যবহৃত রয়ে যাওয়া ৬০৪ কোটি টাকা এখন হাম ও রুবেলাসহ অন্যান্য প্রয়োজনীয় টিকা কেনার কাজে ব্যয় করা হচ্ছে। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সরাসরি তদারকিতে এবং নির্দেশনায় এই সংকট মোকাবিলায় অত্যন্ত দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে বলে তিনি দাবি করেন। বিশেষ করে সংক্রামক ব্যাধি হাসপাতালে মাত্র ১৮ ঘণ্টার মধ্যে নিবিড় পর্যবেক্ষণ কেন্দ্র (আইসিইউ) চালুর বিষয়টি তিনি সাফল্যের উদাহরণ হিসেবে তুলে ধরেন। প্রতিটি সরকারি হাসপাতালেই এখন হাম আক্রান্তদের জন্য পৃথক ওয়ার্ডের ব্যবস্থা করা হয়েছে।
আলোচনার শেষ পর্যায়ে স্বাস্থ্যমন্ত্রী গণমাধ্যমের ভূমিকার ভূয়সী প্রশংসা করেন। তিনি মনে করেন, গণমাধ্যম গঠনমূলক সমালোচনার মাধ্যমে প্রশাসনের ওপর যে চাপ বজায় রাখছে, তা জনস্বার্থ রক্ষায় এবং ভালো কাজ আদায়ে সহায়ক ভূমিকা পালন করছে। দেশের ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে এই সংক্রামক ব্যাধি থেকে রক্ষা করতে সরকার সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিচ্ছে বলে তিনি সংসদকে আশ্বস্ত করেন।
সংক্রামক ব্যাধি দমনে রাজনৈতিক সদিচ্ছা এবং সময়ের সঠিক সিদ্ধান্ত অত্যন্ত জরুরি। দীর্ঘ পাঁচ বছর টিকাদান কর্মসূচিতে স্থবিরতা থাকার যে খেসারত এখন শিশুদের দিতে হচ্ছে, তা ভবিষ্যতে যেন আর না ঘটে সেদিকে সজাগ দৃষ্টি রাখা প্রয়োজন। ঢাকার দুই সিটিসহ সারা দেশে এই কর্মসূচি সফল করতে কেবল সরকারি প্রচেষ্টা নয়, বরং অভিভাবকদের সচেতনতা এবং সক্রিয় অংশগ্রহণই পারে একটি রোগমুক্ত প্রজন্ম নিশ্চিত করতে। স্বাস্থ্য বিভাগের এই তৎপরতা যেন কেবল ঘোষণা বা আমলাতান্ত্রিক জটিলতায় আটকে না থেকে মাঠ পর্যায়ে প্রতিটি শিশুর দোরগোড়ায় পৌঁছায়, সেটাই এখন বড় প্রত্যাশা।