দেশের শিক্ষাব্যবস্থাকে আরও বাস্তবমুখী, যুগোপযোগী ও আনন্দময় করে তুলতে ২০২৮ সাল থেকে সম্পূর্ণ নতুন শিক্ষাক্রম চালু করার পরিকল্পনা হাতে নিয়েছে সরকার। নতুন এই শিক্ষাক্রমে প্রাথমিক ও মাধ্যমিক স্তরে যুক্ত হচ্ছে নতুন চারটি বিষয় এবং সাধারণ শিক্ষার পাশাপাশি জোর দেওয়া হচ্ছে কারিগরি ও তৃতীয় ভাষা শিক্ষার ওপর। সোমবার সচিবালয়ে মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা বিভাগের সম্মেলন কক্ষে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে সরকারের এই নতুন কর্মপরিকল্পনা তুলে ধরেন শিক্ষামন্ত্রী আ ন ম এহছানুল হক মিলন।
শিক্ষার মানোন্নয়ন এবং শিক্ষার্থীদের বৈশ্বিক প্রতিযোগিতায় টিকিয়ে রাখার লক্ষ্যে শিক্ষাক্রমে বড় ধরনের এই পরিবর্তনের ঘোষণা দেওয়া হয়েছে। সরকারের পরিকল্পনা অনুযায়ী, আগামী ২০২৭ সালে বর্তমান শিক্ষাক্রমকে প্রয়োজনীয় পরিমার্জন ও সংশোধন করে বাস্তবায়ন করা হবে। এরপর ২০২৮ সাল থেকে পুরোপুরি নতুন শিক্ষাক্রম চালু করা হবে, যেখানে ব্যাপক পরিবর্তন দেখতে পাবেন শিক্ষক, শিক্ষার্থী ও অভিভাবকরা।
নতুন শিক্ষাক্রমের অন্যতম প্রধান আকর্ষণ হলো নতুন চারটি বিষয়ের সংযোজন। শিক্ষার্থীদের শারীরিক ও মানসিক বিকাশের কথা চিন্তা করে চতুর্থ শ্রেণি থেকেই চালু করা হচ্ছে ‘ক্রীড়া’ ও ‘সংস্কৃতি’ সংক্রান্ত দুটি নতুন বিষয়। এর মাধ্যমে শিক্ষার্থীবান্ধব পরিবেশ সৃষ্টির পাশাপাশি খেলাধুলা ও সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডের মধ্য দিয়ে শিশুদের সৃজনশীলতা বৃদ্ধির উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
অন্যদিকে, ষষ্ঠ শ্রেণি থেকে শিক্ষার্থীদের জন্য বাধ্যতামূলকভাবে যুক্ত করা হচ্ছে ‘কারিগরি ও বৃত্তিমূলক শিক্ষা’ এবং ‘লার্নিং উইথ হ্যাপিনেস’ (আনন্দের সাথে শেখা)। বর্তমান যুগে বাস্তবভিত্তিক ও কর্মমুখী শিক্ষার গুরুত্ব বিবেচনায় কারিগরি শিক্ষাকে ষষ্ঠ শ্রেণি থেকেই অন্তর্ভুক্ত করা হচ্ছে, যাতে শিক্ষার্থীরা তাত্ত্বিক শিক্ষার পাশাপাশি ব্যবহারিক দক্ষতা অর্জন করতে পারে। এছাড়া পড়াশোনার একঘেয়েমি দূর করতে এবং মানসিক চাপ কমাতে ‘লার্নিং উইথ হ্যাপিনেস’ বিষয়টি বিশেষ ভূমিকা রাখবে বলে আশা করা হচ্ছে।
বাংলা ও ইংরেজি ভাষার পাশাপাশি শিক্ষার্থীদের আন্তর্জাতিক যোগাযোগের ক্ষেত্রে আরও দক্ষ করে তুলতে নতুন শিক্ষাক্রমে তৃতীয় একটি ভাষা শেখার ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। বর্তমান শিক্ষাক্রমের কাঠামোর ভেতরেই কোনো একটি বিষয়ের সঙ্গে একটি ‘বড় অধ্যায়’ বা পাঠ যুক্ত করে এই তৃতীয় ভাষা শিক্ষার সুযোগ তৈরি করা হবে। এর ফলে শিক্ষার্থীরা প্রাথমিক বা মাধ্যমিক স্তর থেকেই অন্য একটি আন্তর্জাতিক ভাষা সম্পর্কে প্রাথমিক ধারণা লাভ করতে পারবে।
সংবাদ সম্মেলনে প্রধানমন্ত্রীর শিক্ষা, প্রাথমিক ও গণশিক্ষা বিষয়ক উপদেষ্টা মাহদী আমিন নতুন শিক্ষাক্রমের যৌক্তিকতা তুলে ধরে বলেন, গত দেড় দশকের পুঞ্জীভূত শিক্ষাগত সমস্যাগুলো রাতারাতি বা এক বছরে সমাধান করা সম্ভব নয়। তবে বর্তমান সরকার সর্বোচ্চ আন্তরিকতার সাথে কাজ করছে এবং খুব দ্রুত প্রয়োজনীয় পরিবর্তনগুলো আনা হচ্ছে। শিক্ষাক্রমের ভেতরে যেখানে সংশোধন, সংযোজন ও বিয়োজন প্রয়োজন, তা ধাপে ধাপে সম্পন্ন করা হচ্ছে।
অনুষ্ঠানে অন্যান্যদের মধ্যে উপস্থিত ছিলেন প্রাথমিক ও গণশিক্ষা প্রতিমন্ত্রী ববি হাজ্জাজ, মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা বিভাগের সচিব আবদুল খালেক, কারিগরি ও মাদ্রাসা শিক্ষা বিভাগের সচিব দাউদ মিয়া, মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা অধিদপ্তরের মহাপরিচালক অধ্যাপক খান মইনুদ্দিন আল মাহমুদ সোহেল এবং প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের মহাপরিচালক শাহীনা ফেরদৌসী। উপস্থিত কর্মকর্তারা নতুন শিক্ষাক্রম বাস্তবায়নে মাঠ পর্যায়ে সব ধরনের প্রস্তুতি নেওয়ার ওপর জোর দেন।
শিক্ষা খাতে যেকোনো পরিবর্তনই অত্যন্ত সংবেদনশীল বিষয়। ২০২৮ সাল থেকে যে নতুন শিক্ষাক্রম চালুর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে, তা নিঃসন্দেহে আধুনিক ও সময়োপযোগী। বিশেষ করে চতুর্থ শ্রেণি থেকে ক্রীড়া ও সংস্কৃতি এবং ষষ্ঠ শ্রেণি থেকে কারিগরি শিক্ষা ও মানসিক স্বাস্থ্যের দিকে নজর দেওয়া অত্যন্ত ইতিবাচক পদক্ষেপ। তবে যেকোনো নতুন শিক্ষাক্রমের মূল সাফল্য নির্ভর করে তা শ্রেণিকক্ষে কতটুকু কার্যকরভাবে প্রয়োগ করা যাচ্ছে তার ওপর। আমাদের দেশের সাধারণ বিদ্যালয়গুলোর পরিকাঠামো, ল্যাব সুবিধা এবং শিক্ষকদের যথাযথ প্রশিক্ষণ দেওয়ার বিষয়টি এখানে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। নতুন শিক্ষাক্রম কেবল বইয়ের পাতায় সীমাবদ্ধ না রেখে তা যেন মাঠ পর্যায়ে সঠিক পদ্ধতিতে বাস্তবায়িত হয়, সেদিকে নীতিনির্ধারকদের তীক্ষ্ণ দৃষ্টি রাখা প্রয়োজন। আমরা কি আমাদের ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে একটি প্রতিযোগিতামূলক ও আনন্দময় শিক্ষাব্যবস্থা উপহার দিতে প্রস্তুত? এই প্রশ্নের উত্তর লুকিয়ে আছে আগামী দিনগুলোর সঠিক বাস্তবায়নে।