দেশের রেল যোগাযোগ ব্যবস্থাকে আধুনিক করতে ৩৬ কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত দুটি ডিজিটাল ওয়াশিংপ্ল্যান্ট মাত্র দুই বছরেই অকেজো হয়ে পড়েছে। যান্ত্রিক ত্রুটি আর ভুল পরিকল্পনার খেসারত দিতে এখন কয়েক গুণ বেশি সময় ও অর্থ খরচ করে সনাতন পদ্ধতিতে ট্রেন পরিষ্কার করতে হচ্ছে রেল কর্তৃপক্ষকে।
আধুনিক প্রযুক্তির ছোঁয়ায় রেলের ভোল পাল্টে দেওয়ার স্বপ্ন নিয়ে ২০২১ সালে ঢাকার কমলাপুর ও রাজশাহী রেলস্টেশনে চালু করা হয়েছিল দুটি অত্যাধুনিক ডিজিটাল ওয়াশিংপ্ল্যান্ট। উদ্দেশ্য ছিল, যেখানে একটি ট্রেন পরিষ্কার করতে দেড় ঘণ্টা সময় লাগে, সেখানে মাত্র ১০ মিনিটেই ঝকঝকে হয়ে বেরিয়ে আসবে পুরো ট্রেন। কিন্তু সেই স্বপ্ন এখন রেলের জন্য এক বিশাল বিড়ম্বনায় পরিণত হয়েছে। স্থাপনের মাত্র দুই বছরের মাথায় কার্যক্রম পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যাওয়ায় এগুলো এখন রেলের গলার কাঁটা হয়ে দাঁড়িয়েছে।
সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, আধুনিক সেই স্বয়ংক্রিয় মেশিনগুলো এখন স্থবির হয়ে পড়ে আছে। ট্রেনের ভেতর ও বাহিরের অংশ সঠিকভাবে পরিষ্কার করতে না পারায় পরিচ্ছন্নকর্মীরা আবার সেই পুরোনো বালতি আর সাবান-পানির সনাতন পদ্ধতিতে ফিরে গেছেন। তাদের অভিযোগ, ওয়াশিংপ্ল্যান্ট ব্যবহারের ফলে তাদের কাজের চাপ কমার বদলে উল্টো তিন গুণ বেড়েছে। যান্ত্রিক সীমাবদ্ধতার কারণে ট্রেনের অনেক অংশই অপরিষ্কার থেকে যায়, যা পরে তাদের আবার হাতেই পরিষ্কার করতে হয়।
কমলাপুর রেলস্টেশনের চিফ ইয়ার্ড মাস্টার আবদুল্লাহ আল মাসুদ এই ব্যর্থতার পেছনে কারিগরি ত্রুটির চেয়েও ভুল পরিকল্পনাকে বেশি দায়ী করেছেন। তার মতে, যেখানে ওয়াশিংপ্ল্যান্টটি স্থাপন করার কথা ছিল, সেখানে না করে অত্যন্ত সংকীর্ণ এবং ভুল স্থানে এটি বসানো হয়েছে। এর ফলে একটি কাজ চারবার করতে হচ্ছে, যা সময়ের অপচয় ছাড়া আর কিছুই নয়। স্থান স্বল্পতার কারণে ট্রেনগুলোকে মেশিনের ভেতর দিয়ে চালনা করাও দুরুহ হয়ে পড়েছে।
এদিকে রেলওয়ের মহাপরিচালক মো. আফজাল হোসেন এই প্রকল্পের ত্রুটি ও ব্যর্থতা স্বীকার করে নিয়েছেন। তবে তিনি সমাধান হিসেবে আবারও নতুন প্রকল্পের দিকেই ইঙ্গিত দিয়েছেন। তার মতে, বর্তমান অবকাঠামোর বিন্যাস বা লেআউট পরিবর্তন করে যদি একই লাইনে ওয়াশিংপ্ল্যান্ট আনা যায়, তবেই সুফল পাওয়া সম্ভব। অর্থাৎ কোটি কোটি টাকা ব্যয়ের পর এখন সেই ভুল সংশোধনের জন্য আবারও নতুন করে অর্থ বরাদ্দের পথ খুঁজছে রেল কর্তৃপক্ষ।
কিন্তু এই দায়মুক্তির সুযোগ দিতে নারাজ যোগাযোগ বিশেষজ্ঞরা। রেল বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ড. হাদিউজ্জামান একে 'মার্জনাতীত অপরাধ' হিসেবে আখ্যা দিয়েছেন। তিনি প্রশ্ন তোলেন, এই প্রকল্পের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা তো বিদেশে গিয়ে হাতে-কলমে প্রশিক্ষণ নিয়ে এসেছেন এবং ওয়াশিংপ্ল্যান্টের কার্যকারিতা দেখে এসেছেন। তবে কেন এমন ভুল জায়গায় এটি স্থাপন করা হলো? তার মতে, জনগণের ট্যাক্সের টাকার এমন অপচয় কোনোভাবেই সাধারণ ভুল হতে পারে না। এটি চরম গাফিলতি এবং দুর্নীতিরই নামান্তর।
রেলওয়ের সাধারণ কর্মীরা মনে করছেন, সঠিক তদারকি এবং কারিগরি সক্ষমতা যাচাই না করেই তড়িঘড়ি করে এই প্রকল্প বাস্তবায়ন করা হয়েছে। ফলে সরকারের বিপুল পরিমাণ অর্থের অপচয় তো হয়েছেই, পাশাপাশি রেলের ভাবমূর্তিও ক্ষুণ্ণ হয়েছে। এখন ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে অতিরিক্ত অর্থ খরচ করে ডিজিটাল বাংলাদেশের পথে হাঁটতে গিয়ে আমরা প্রায়শই ভৌত অবকাঠামো নির্মাণে যতটা আগ্রহী হই, তার রক্ষণাবেক্ষণ এবং সঠিক পরিকল্পনা প্রণয়নে ততটাই উদাসীন। ৩৬ কোটি টাকার এই প্রকল্প ব্যর্থ হওয়া কেবল অর্থের ক্ষতি নয়, বরং এটি আমাদের রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থাপনার অদূরদর্শিতারই বহিঃপ্রকাশ। এই ব্যর্থতার জন্য যারা দায়ী, তাদের জবাবদিহিতার আওতায় আনা না হলে ভবিষ্যতে এমন আরও জনবিরোধী ও অকেজো প্রকল্প বাস্তবায়নের ঝুঁকি থেকেই যাবে। জনকল্যাণে নেওয়া প্রকল্প যেন ব্যক্তিস্বার্থ বা অযোগ্যতার বলি না হয়, সেদিকে সরকারের কঠোর নজরদারি প্রয়োজন।