মধ্যপ্রাচ্যে ইরান ও ইসরায়েলের মধ্যকার ক্রমবর্ধমান উত্তজনায় যখন বিশ্বব্যাপী জ্বালানি তেলের বাজার টালমাটাল, ঠিক তখনই আশার আলো দেখাচ্ছে দেশের প্রধান সমুদ্রবন্দর চট্টগ্রাম। শিল্প-কারখানা সচল রাখা ও সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রা স্বাভাবিক করতে তরলীকৃত গ্যাস ও জ্বালানি তেল নিয়ে বন্দরে নোঙর করেছে বিশাল আকৃতির চারটি জাহাজ।
বর্তমান বিশ্বরাজনীতির প্রেক্ষাপটে জ্বালানি নিরাপত্তা প্রতিটি দেশের জন্য সবথেকে বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। বিশেষ করে মধ্যপ্রাচ্যের অস্থিরতা বিশ্বজুড়ে তেলের সরবরাহ ব্যবস্থাকে এক অনিশ্চয়তার মুখে ঠেলে দিয়েছে। এমন এক সংকটময় মুহূর্তে চট্টগ্রাম বন্দরে একে একে চারটি বড় জাহাজের আগমন বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ বাজারে জ্বালানির নিরবচ্ছিন্ন সরবরাহ নিশ্চিত করতে বড় ভূমিকা রাখবে বলে মনে করা হচ্ছে। সোমবার চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের সামুদ্রিক বিভাগ (মেরিন বিভাগ) থেকে প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে এই স্বস্তিদায়ক তথ্য নিশ্চিত করা হয়েছে।
বন্দর সূত্রে জানা গেছে, গত কয়েক দিনে বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে এই জাহাজগুলো বাংলাদেশের জলসীমায় এসে পৌঁছেছে। ভারত, মালয়েশিয়া, নাইজেরিয়া ও চীন থেকে আসা এই জাহাজগুলোতে রয়েছে তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি), তরলীকৃত পেট্রোলিয়াম গ্যাস (এলপিজি) এবং গ্যাস অয়েল (শিল্প ও যানবাহনে ব্যবহৃত এক প্রকার জ্বালানি তেল)। বর্তমানে এই জাহাজগুলো থেকে অত্যন্ত দ্রুততার সাথে পণ্য খালাসের প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে।
আগত জাহাজগুলোর মধ্যে ভারত থেকে আসা ‘গ্যাস চ্যালেঞ্জার’ নামক জাহাজটি গত ৩১ মার্চ বন্দরে পৌঁছায়। এটি বর্তমানে সীতাকুণ্ডের ভাটিয়ারী উপকূলীয় এলাকায় অবস্থান করছে। জাহাজটি থেকে রান্নার কাজে ব্যবহৃত তরলীকৃত পেট্রোলিয়াম গ্যাস খালাস করার প্রক্রিয়া চলমান। অন্যদিকে, মালয়েশিয়া থেকে বিপুল পরিমাণ গ্যাস অয়েল বা ডিজেল জাতীয় জ্বালানি নিয়ে আসা ‘শান গ্যাং ফা শিয়ান’ জাহাজটি গত ৩ এপ্রিল বন্দরে নোঙর করেছে। এটি বর্তমানে বন্দরের বিশেষায়িত ‘ডিওজে-৬’ (তেলবাহী জাহাজ ভেড়ানোর নির্দিষ্ট ঘাট) এলাকায় অবস্থান করছে। আগামী ৭ এপ্রিলের মধ্যে এই জাহাজটির পণ্য পুরোপুরি নামিয়ে ফেলার লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছে বন্দর কর্তৃপক্ষ।
জ্বালানি খাতের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ উপাদান হচ্ছে তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস বা এলএনজি। দেশের বিদ্যুৎ কেন্দ্রগুলোর চাকা সচল রাখতে এর বিকল্প নেই। নাইজেরিয়া থেকে এই মূল্যবান সম্পদ নিয়ে ‘কুল ভয়েজার’ নামক একটি বিশাল জাহাজ গত ৫ এপ্রিল বন্দরে পৌঁছেছে। জাহাজটি বর্তমানে মহেশখালীর গভীর সমুদ্রে অবস্থিত ‘এফএসআরইউ’ (ভাসমান এলএনজি টার্মিনাল বা বিশেষায়িত গ্যাস রূপান্তর কেন্দ্র) এলাকায় অবস্থান করছে। আশা করা হচ্ছে, আগামী ৮ এপ্রিলের মধ্যে এর সমস্ত গ্যাস জাতীয় গ্রিডে সরবরাহের জন্য প্রস্তুত করা হবে। এছাড়া চীন থেকে এলপিজি নিয়ে আসা ‘গ্যাস জার্নি’ নামক আরেকটি জাহাজ গত ৫ এপ্রিল বন্দরে নোঙর করেছে। এটি বর্তমানে ‘চার্লি’ সংকেতযুক্ত গভীর সমুদ্রে অবস্থান করছে এবং এর খালাস কার্যক্রমও দ্রুততম সময়ের মধ্যে শেষ হবে বলে আশা করা হচ্ছে।
দেশের জ্বালানি পরিস্থিতি নিয়ে যখন সাধারণ মানুষের মধ্যে নানা উদ্বেগ কাজ করছে, তখন এই বিপুল পরিমাণ জ্বালানি পণ্যের আগমন সরকারের সক্ষমতারই বহিঃপ্রকাশ। চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের সচিব সৈয়দ রেফায়েত হামিম জানান, দেশের বিদ্যুৎ উৎপাদন ও শিল্প উৎপাদন সচল রাখাই এখন প্রধান লক্ষ্য। এই লক্ষ্য পূরণে জ্বালানি নিয়ে আসা জাহাজগুলোকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেওয়া হচ্ছে। কোনো ধরনের লাল ফিতার দৌরাত্ম্য ছাড়াই যাতে এই জ্বালানিগুলো দ্রুত খালাস হয়ে জাতীয় পর্যায়ে সরবরাহ করা যায়, সে জন্য বন্দরে বিশেষ তদারকি সেল গঠন করা হয়েছে।
উল্লেখ্য যে, চট্টগ্রাম বন্দর দিয়ে আসা এই জ্বালানি পণ্যগুলো কেবল পরিবহন খাতেই নয়, বরং আসন্ন গরমের মৌসুমে বিদ্যুৎ উৎপাদনেও বড় ধরনের স্বস্তি দেবে। জাহাজগুলো নির্ধারিত সময়ের মধ্যে পণ্য খালাস করতে পারলে দেশের অভ্যন্তরে লোডশেডিংয়ের মাত্রা কমে আসবে এবং শিল্প-কারখানার উৎপাদন ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কাও দূর হবে।
একটি দেশের অর্থনীতির মেরুদণ্ড হলো তার জ্বালানি নিরাপত্তা। মধ্যপ্রাচ্যের অস্থিতিশীলতায় বিশ্ব যখন দাম বাড়ার আশঙ্কায় কাঁপছে, তখন ৪টি বিশাল জাহাজের নিরাপদ আগমন বাংলাদেশের কৌশলগত ব্যবস্থাপনার বড় জয়। তবে কেবল আমদানিই যথেষ্ট নয়, বরং আমদানিকৃত এই জ্বালানি যেন সাধারণ মানুষ ও প্রকৃত শিল্প মালিকদের কাছে ন্যায্য মূল্যে পৌঁছায়, সেদিকেও কড়া নজরদারি প্রয়োজন। চট্টগ্রাম বন্দরের এই তৎপরতা আমাদের আশাবাদী করে তোলে যে, বৈশ্বিক সংকটেও আমরা আমাদের উন্নয়নের চাকা সচল রাখতে সক্ষম হব