জাতীয় সংসদে গত বছরের শেষ নাগাদ ব্যাংক খাতের খেলাপি ঋণের একটি ভয়াবহ চিত্র তুলে ধরেছেন অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী। অর্থমন্ত্রীর দেওয়া তথ্যমতে, বর্তমানে দেশে খেলাপি ঋণের মোট পরিমাণ ৫ লাখ ৪৪ হাজার কোটি টাকা ছাড়িয়ে গেছে, যার মধ্যে বড় একটি অংশই নির্দিষ্ট কিছু প্রতিষ্ঠানের কাছে আটকে আছে।
সোমবার জাতীয় সংসদে প্রশ্নোত্তরের সময় ব্যাংক খাতের বিশৃঙ্খলা ও খেলাপি ঋণের বর্তমান পরিস্থিতি নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য প্রদান করেন অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী। জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) সংসদ সদস্য হাসনাত আব্দুল্লাহর এক প্রশ্নের জবাবে তিনি জানান, গত বছরের ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত ব্যাংকিং খাতে মোট খেলাপি ঋণের স্থিতির পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৫ লাখ ৪৪ হাজার ৮৩১ কোটি ৮৮ লাখ টাকা। অর্থনীতিবিদরা এই বিশাল অঙ্কের খেলাপি ঋণকে দেশের আর্থিক খাতের জন্য একটি বড় ঝুঁকি হিসেবে দেখছেন।
সংসদকে জানানো অর্থমন্ত্রীর তথ্য অনুযায়ী, দেশের শীর্ষ ২০টি ঋণখেলাপি প্রতিষ্ঠানের তালিকায় কয়েকটি বড় শিল্পগোষ্ঠীর আধিপত্য লক্ষ্য করা গেছে। তালিকার শীর্ষে রয়েছে এস আলম সুপার এডিবল অয়েল লিমিটেড, এস আলম ভেজিটেবল অয়েল লিমিটেড, এস আলম রিফাইন্ড সুগার ইন্ডাস্ট্রিজ লিমিটেড এবং এস আলম কোল্ড রোল্ড স্টিলস লিমিটেড। অর্থাৎ শীর্ষ ২০-এর তালিকায় এস আলম গ্রুপের একাধিক প্রতিষ্ঠানের নাম উঠে এসেছে।
এছাড়া ঋণখেলাপির এই তালিকায় রয়েছে সোনালী ট্রেডার্স, বাংলাদেশ এক্সপোর্ট ইমপোর্ট কোম্পানি লিমিটেড (বেক্সিমকো), গ্লোবাল ট্রেডিং করপোরেশন লিমিটেড, চেমন ইস্পাত লিমিটেড, এস আলম ট্রেডিং কোম্পানি প্রাইভেট লিমিটেড এবং ইনফিনিট সিআর স্ট্রিপস ইন্ডাস্ট্রিজ লিমিটেড। তালিকার পরবর্তী অবস্থানে রয়েছে কেয়া কসমেটিকস লিমিটেড, দেশবন্ধু সুগার মিলস লিমিটেড, পাওয়ার প্যাক মুতিয়ারা কেরানীগঞ্জ পাওয়ার প্ল্যান্ট লিমিটেড, পাওয়ার প্যাক মুতিয়ারা জামালপুর পাওয়ার প্ল্যান্ট লিমিটেড এবং প্যাসিফিক বাংলাদেশ টেলিকম লিমিটেড (যা একসময় সিটিসেল নামে পরিচিত ছিল)।
তালিকায় থাকা আরও কয়েকটি প্রতিষ্ঠান হলো—কর্ণফুলী ফুডস (প্রা.) লিমিটেড, মুরাদ এন্টারপ্রাইজ, সিএলসি পাওয়ার কোম্পানি লিমিটেড, বেক্সিমকো কমিউনিকেশন্স লিমিটেড এবং রংধনু বিল্ডার্স (প্রা.) লিমিটেড। উল্লেখ্য যে, এই প্রতিষ্ঠানগুলোর কাছে ব্যাংকগুলোর হাজার হাজার কোটি টাকা পাওনা রয়েছে যা সময়মতো পরিশোধ না করায় তা খেলাপি ঋণে (যে ঋণ নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে পরিশোধ করা হয় না) পরিণত হয়েছে।
অর্থমন্ত্রী সংসদকে আশ্বস্ত করে বলেন, খেলাপি ঋণ আদায়ে সরকার ও কেন্দ্রীয় ব্যাংক (বাংলাদেশ ব্যাংক) অত্যন্ত কঠোর অবস্থানে রয়েছে। ঋণের টাকা ফেরত আনতে আইনি ব্যবস্থার পাশাপাশি নানাবিধ প্রশাসনিক পদক্ষেপ গ্রহণ করা হয়েছে। তিনি আরও জানান, খেলাপি ঋণের এই সংস্কৃতি বন্ধ করতে ব্যাংকিং নীতিমালায় প্রয়োজনীয় সংস্কারের উদ্যোগও নেওয়া হয়েছে।
দেশের ব্যাংকিং খাতে ৫ লাখ কোটি টাকার ওপর খেলাপি ঋণ থাকা সুস্থ অর্থনীতির লক্ষণ নয়। শীর্ষ ২০ প্রতিষ্ঠানের তালিকা প্রকাশের মাধ্যমে স্বচ্ছতার একটি প্রতিফলন ঘটলেও, মূল চ্যালেঞ্জ হলো এই টাকা উদ্ধার করা। সাধারণ মানুষের আমানতের সুরক্ষা নিশ্চিত করতে এবং ছোট উদ্যোক্তাদের ঋণের পথ সুগম করতে বড় খেলাপিদের কাছ থেকে টাকা আদায়ে দৃশ্যমান ও কঠোর পদক্ষেপ নেওয়া এখন সময়ের দাবি।