বিশ্বজুড়ে চলমান অস্থিরতা ও জ্বালানি সংকটের আঁচ লেগেছে দেশের শিক্ষাখাতেও। বিদ্যুৎ ও তেলের ব্যবহার কমাতে মহানগর এলাকার শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে সশরীরে ক্লাসের পাশাপাশি অন্তর্জাল বা অনলাইনে পাঠদান শুরুর এক ব্যতিক্রমী পরিকল্পনা হাতে নিয়েছে শিক্ষা মন্ত্রণালয়।
মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধাবস্থা এবং আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেলের অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধির ফলে দেশীয় অর্থনীতিতে যে চাপ তৈরি হয়েছে, তা মোকাবিলায় নানা সাশ্রয়ী পদক্ষেপ নিচ্ছে সরকার। এরই ধারাবাহিকতায় মহানগর এলাকার স্কুল-কলেজগুলোতে যাতায়াত ও বিদ্যুৎ খরচ কমাতে পাঠদান পদ্ধতিতে বড় ধরনের পরিবর্তনের প্রস্তাব করা হয়েছে। নতুন এই পরিকল্পনায় বিশ্ববিদ্যালয় বাদে মহানগরীর সাধারণ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে সশরীরে উপস্থিতির পাশাপাশি অনলাইনে ক্লাস নেওয়ার বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচিত হচ্ছে।
শিক্ষা মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, প্রস্তাবিত এই রূপরেখা অনুযায়ী সপ্তাহে ছয় কর্মদিবসের মধ্যে তিন দিন শিক্ষার্থীরা বিদ্যালয়ে সশরীরে উপস্থিত হবে এবং বাকি তিন দিন ঘর থেকে অনলাইনের মাধ্যমে পাঠ গ্রহণে অংশ নেবে। এক্ষেত্রে একদিন সশরীরে ক্লাসের পরদিন অনলাইনে ক্লাস—এভাবে পর্যায়ক্রমে পাঠদান পরিচালনার একটি খসড়া প্রস্তাব তৈরি করা হয়েছে। তবে পাঠদানের মান ঠিক রাখতে একটি বিশেষ শর্ত রাখা হয়েছে; তা হলো অনলাইনে ক্লাস নেওয়ার সময়ও শিক্ষকদের সশরীরে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে উপস্থিত থাকতে হবে। অর্থাৎ শিক্ষকরা বিদ্যালয়ে বসেই ইন্টারনেটের মাধ্যমে পাঠদান পরিচালনা করবেন। এছাড়া বিজ্ঞানের বিভিন্ন ব্যবহারিক ক্লাস (হাতে-কলমে শিক্ষার কাজ) সশরীরে উপস্থিত থেকেই সম্পন্ন করতে হবে।
গত মঙ্গলবার (৩১ মার্চ) সচিবালয়ে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে শিক্ষামন্ত্রী আ ন ম এহছানুল হক মিলন এই সম্ভাব্য পরিবর্তনের বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন। তিনি জানান, বৃহস্পতিবার (২ এপ্রিল) অনুষ্ঠেয় মন্ত্রিসভার বৈঠকে বিষয়টি বিস্তারিতভাবে উপস্থাপন করা হবে। সেখানে প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে পরামর্শ এবং বর্তমান পরিস্থিতির সামগ্রিক বিশ্লেষণ শেষে এই ‘মিশ্র পদ্ধতি’ (অনলাইন ও সশরীরে সমন্বিত ব্যবস্থা) চালুর বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে। মন্ত্রিসভার সবুজ সংকেত পেলেই মহানগরীর শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য নতুন এই সময়সূচি ঘোষণা করা হবে।
সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, মহানগর এলাকায় হাজার হাজার শিক্ষার্থী ও অভিভাবকের যাতায়াতের কারণে প্রতিদিন বিপুল পরিমাণ জ্বালানি ব্যয় হয়। এই নতুন পদ্ধতি কার্যকর হলে সড়কে যানবাহনের চাপ কমবে, যা সরাসরি জ্বালানি সাশ্রয়ে বড় ভূমিকা রাখবে। একই সঙ্গে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে শীতাতপ নিয়ন্ত্রণ যন্ত্র (এসি), ফ্যান ও বাতি ব্যবহারের সময় কমে আসায় বিপুল পরিমাণ বিদ্যুৎ সাশ্রয় করা সম্ভব হবে।
তবে এই পদ্ধতি কেবল মহানগর এলাকার জন্য প্রযোজ্য হতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। কারণ গ্রামের তুলনায় শহরের শিক্ষার্থীদের ইন্টারনেট ব্যবহারের সুবিধা বেশি। বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্ষেত্রে এমন কোনো সিদ্ধান্ত এখনও চূড়ান্ত না হলেও পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করে পরবর্তী সময়ে ব্যবস্থা নেওয়া হতে পারে। শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের এই উদ্যোগটি মূলত একটি সাময়িক কৌশল হিসেবে দেখা হচ্ছে, যাতে আন্তর্জাতিক বাজারের অস্থিতিশীল পরিস্থিতি সামাল দেওয়া যায়।
জ্বালানি সাশ্রয়ের এই উদ্যোগটি পরিবেশ ও অর্থনীতির জন্য ইতিবাচক হলেও শিক্ষার্থীদের শিক্ষা জীবনে এর প্রভাব কেমন হবে, তা নিয়ে ভাবার অবকাশ রয়েছে। করোনা মহামারির সময়ে আমরা দেখেছি যে অনলাইন ক্লাস অনেক ক্ষেত্রে কার্যকর হলেও প্রান্তিক ও দরিদ্র পরিবারের সন্তানদের জন্য তা এক প্রকার ডিজিটাল বৈষম্য তৈরি করেছিল। সরকারের এই নতুন পরিকল্পনা বাস্তবায়নের সময় যেন কোনোভাবেই শিক্ষার গুণগত মান ব্যাহত না হয় এবং সব শিক্ষার্থীর জন্য ইন্টারনেটের সমান সুযোগ নিশ্চিত করা যায়, সেদিকে বিশেষ নজর রাখা প্রয়োজন। সংকটের সময়ে ত্যাগের প্রয়োজন আছে, তবে সেই ত্যাগ যেন আগামীর ভবিষ্যৎ গড়ার পথে বাধা না হয়ে দাঁড়ায়।