দিনাজপুরের হিলি স্থলবন্দরে আমদানিকৃত পণ্য দেশের বিভিন্ন প্রান্তে পৌঁছে দেওয়ার ক্ষেত্রে বড় ধরনের প্রতিবন্ধকতা হয়ে দাঁড়িয়েছে হঠাৎ বেড়ে যাওয়া ট্রাক ভাড়া। জ্বালানি তেলের সংকটের নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে পণ্য পরিবহনে, যার ফলে গন্তব্যভেদে মালবাহী গাড়ির ভাড়া পাঁচ থেকে ছয় হাজার টাকা পর্যন্ত বৃদ্ধি পেয়েছে। এই অস্বাভাবিক ভাড়া বৃদ্ধির ফলে আমদানিকৃত নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসের দাম বেড়ে যাওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে, যা সরাসরি সাধারণ ভোক্তার জীবনযাত্রার ওপর বাড়তি চাপ সৃষ্টি করবে।
দেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম এই স্থলবন্দর দিয়ে নিয়মিতভাবে পিঁয়াজ, আদা, রসুনসহ বিভিন্ন খাদ্যপণ্য ভারত থেকে আমদানি করা হয়। তবে গত কয়েক দিন ধরে জ্বালানি তেলের প্রাপ্যতায় কিছুটা অনিশ্চয়তা দেখা দেওয়ায় এর সরাসরি প্রভাব পড়েছে পরিবহন খাতে। স্থলবন্দর থেকে পণ্য খালাস করে দেশের বড় বড় বাজারগুলোতে নেওয়ার জন্য প্রয়োজনীয় ট্রাকের ভাড়া এখন আকাশচুম্বী। বিশেষ করে চট্টগ্রাম ও সিলেটের মতো দূরপাল্লার পথে ভাড়া সবচেয়ে বেশি বেড়েছে।
পরিবহন সংশ্লিষ্টদের সাথে কথা বলে জানা গেছে, চট্টগ্রাম রুটে ১৫ টন (প্রায় ৪০২ মণ) পণ্য পরিবহনের জন্য আগে যেখানে ২৫ হাজার টাকা ভাড়া দিতে হতো, বর্তমানে সেখানে মালিক ও চালকরা ৩০ থেকে ৩১ হাজার টাকা দাবি করছেন। একইভাবে ঢাকা রুটে ১৭ টন পণ্য পরিবহনের ভাড়া আগে ১৭ হাজার টাকা থাকলেও এখন তা বেড়ে ২১ হাজার টাকারও বেশি দাঁড়িয়েছে। মাত্র কয়েক দিনের ব্যবধানে এই কয়েক হাজার টাকার ব্যবধান সাধারণ ব্যবসায়ীদের কপালে চিন্তার ভাঁজ ফেলেছে।
পরিবহন শ্রমিক ও চালকদের মধ্যে চরম অসন্তোষ লক্ষ করা গেছে। চট্টগ্রামগামী ট্রাকচালক আবুল কালাম ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, ‘কয়েক দিনের ব্যবধানে প্রতিটি পথে ট্রাক ভাড়া ৫-৬ হাজার টাকা করে বেড়ে গেছে। তেলের সমস্যার কথা বলে মালিকরা ভাড়া বাড়ালেও আমাদের বেতন বা খোরাকি বাড়ছে না। এই অবস্থা চলতে থাকলে সাধারণ চালক ও ব্যবসায়ীরা পথে বসে যাবেন।’ বগুড়ার চালক রফিকও একই সুরে কথা বললেন। তিনি এক গাড়ি চাল নিয়ে গন্তব্যে যাওয়ার পথে জানান, তাকে আগের চেয়ে চার হাজার টাকা বেশি ভাড়া দিতে হয়েছে। এই বাড়তি খরচ শেষ পর্যন্ত পণ্যের দাম বাড়িয়ে দেবে, যার ভার বহন করতে হবে সাধারণ মানুষকে।
তবে এই ভাড়া বৃদ্ধি নিয়ে ব্যবসায়ীদের মধ্যে ভিন্ন মত রয়েছে। চট্টগ্রাম থেকে আসা ব্যবসায়ী আব্দুস সুবহান সরাসরি অভিযোগ করেন যে, জ্বালানি সংকটের বিষয়টি অনেকাংশেই কৃত্রিম। তার মতে, বাজারে ডিজেলের (এক প্রকার জ্বালানি তেল) তেমন সংকট নেই এবং ট্রাকগুলো পর্যাপ্ত তেল নিয়েই চলাচল করছে। মূলত তেলের অভাবকে অজুহাত হিসেবে ব্যবহার করে ট্রাক মালিকপক্ষ সিন্ডিকেট (অসাধু চক্র) করে ভাড়া বাড়িয়ে দিয়েছেন। তিনি বলেন, ‘আমরা সাধারণ ব্যবসায়ীরা এখন পরিবহন মালিকদের কাছে জিম্মি হয়ে পড়েছি। এই বাড়তি ভাড়ার কারণে আমাদের লাভের বদলে লোকসানের শঙ্কা তৈরি হয়েছে।’
এ বিষয়ে স্থানীয় ট্রাক মালিক সমিতির একজন নেতা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, দেশে পেট্রোল ও অকটেনের ক্ষেত্রে কিছুটা সংকট থাকলেও ডিজেলের সরবরাহ মোটামুটি স্বাভাবিক। তবে নির্দিষ্ট সময়ে পাম্পগুলোতে তেল না পাওয়া বা দীর্ঘ সময় লাইনে দাঁড়িয়ে থাকার কারণে ট্রাকের যাতায়াতে সময় বেশি লাগছে। এই সময়ক্ষেপণ ও আনুষঙ্গিক খরচের কারণেই ভাড়ার ওপর কিছুটা প্রভাব পড়তে শুরু করেছে।
হিলি স্থলবন্দরের আমদানিকারক ও স্থানীয় সিঅ্যান্ডএফ এজেন্টরা (আমদানি-রপ্তানি তদারকি প্রতিনিধি) মনে করছেন, পরিবহন খাতের এই বিশৃঙ্খলা দ্রুত নিয়ন্ত্রণ করা না গেলে বাজারে পণ্যের সরবরাহ কমে যেতে পারে। বিশেষ করে পচনশীল পণ্যের ক্ষেত্রে ট্রাক না পাওয়া বা বাড়তি ভাড়ার কারণে আমদানিকারকরা বড় ধরনের ক্ষতির মুখে পড়বেন। এর ফলে চাল, ডাল ও তেলের মতো নিত্যপণ্যের খুচরা দাম আবারও বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
জ্বালানি সংকটের দোহাই দিয়ে পরিবহন ভাড়া বাড়ানো বাংলাদেশের একটি পুরনো সংস্কৃতিতে পরিণত হয়েছে। হিলি স্থলবন্দরের বর্তমান পরিস্থিতি আমাদের জাতীয় অর্থনীতির সরবরাহ ব্যবস্থার দুর্বলতাকেই ফুটিয়ে তুলছে। যদি ডিজেলের সরবরাহ স্বাভাবিক থাকে, তবে কেন ট্রাক ভাড়া পাঁচ-ছয় হাজার টাকা বাড়বে—এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজে বের করা প্রশাসনের দায়িত্ব। পরিবহন খাতের এই অদৃশ্য সিন্ডিকেট ভাঙতে না পারলে নিত্যপণ্যের বাজারে স্থিতিশীলতা আনা অসম্ভব হয়ে পড়বে। সরকারের উচিত এখনই বাজার তদারকি এবং পরিবহন ভাড়ার ক্ষেত্রে একটি নির্দিষ্ট মানদণ্ড নির্ধারণ করে দেওয়া, যাতে সংকটকে পুঁজি করে কেউ সাধারণ মানুষের পকেট কাটতে না পারে।