কেরাণীগঞ্জের কদমতলী এলাকায় একটি গ্যাস লাইটার তৈরির কারখানায় ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটেছে। ফায়ার সার্ভিসের সাতটি ইউনিটের দীর্ঘ প্রচেষ্টায় আগুন নিয়ন্ত্রণে এলেও ধ্বংসস্তূপ থেকে এখন পর্যন্ত পাঁচজনের মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছে।
ঢাকার উপকণ্ঠ কেরাণীগঞ্জের ব্যস্ততম কদমতলী গোলচত্বর এলাকায় আজ শনিবার দুপুরে হঠাৎ করেই একটি টিনশেড কারখানায় আগুনের সূত্রপাত হয়। মুহূর্তের মধ্যেই আগুনের লেলিহান শিখা পুরো কারখানায় ছড়িয়ে পড়ে। কারখানার ভেতরে থাকা দাহ্য পদার্থ ও গ্যাস লাইটারের উপস্থিতির কারণে আগুনের তীব্রতা দ্রুত বৃদ্ধি পায় এবং চারপাশ ধোঁয়ায় আচ্ছন্ন হয়ে পড়ে। খবর পেয়ে দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছায় ফায়ার সার্ভিসের কর্মীরা।
ফায়ার সার্ভিসের নিয়ন্ত্রণ কক্ষের দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা রোজিনা আক্তার জানান, বেলা সোয়া ১টার দিকে তারা অগ্নিকাণ্ডের খবর পান। ঘটনার গুরুত্ব বিবেচনা করে একে একে সাতটি ইউনিট উদ্ধারকাজে অংশ নেয়। প্রায় দেড় ঘণ্টার নিরলস পরিশ্রমের পর দুপুর পৌনে ৩টার দিকে আগুন নিয়ন্ত্রণে আনতে সক্ষম হন ফায়ার সার্ভিসের কর্মীরা। আগুন নিয়ন্ত্রণে আসার পরপরই কারখানার ভেতরে তল্লাশি শুরু করেন উদ্ধারকারীরা।
উদ্ধার অভিযান চলাকালীন কারখানার বিভিন্ন প্রান্ত থেকে একে একে পাঁচটি নিথর দেহ উদ্ধার করা হয়। নিহতদের পরিচয় তাৎক্ষণিকভাবে নিশ্চিত করা সম্ভব হয়নি। মরদেহগুলো ময়নাতদন্তের জন্য স্থানীয় হাসপাতালের মর্গে পাঠানোর প্রক্রিয়া চলছে। ফায়ার সার্ভিসের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, ভেতরে আরও কেউ আটকে আছে কি না তা নিশ্চিত হতে এখনো তল্লাশি চালানো হচ্ছে। ক্ষয়ক্ষতির সঠিক পরিমাণ এবং আগুনের প্রকৃত উৎস জানতে একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হতে পারে।
প্রত্যক্ষদর্শীরা জানিয়েছেন, আগুনের তীব্রতা এতই বেশি ছিল যে কারখানার আশপাশের বাসিন্দাদের মধ্যে চরম আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। আশপাশের ভবনগুলো থেকেও মানুষজন নিরাপদ আশ্রয়ে সরে যেতে শুরু করেন। আগুনের ধোঁয়ায় এলাকার আকাশ কালো হয়ে গিয়েছিল এবং তীব্র গরমে ফায়ার সার্ভিস কর্মীদেরও কাজ করতে বেশ বেগ পেতে হয়েছে। প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হচ্ছে, বৈদ্যুতিক শর্ট সার্কিট (বিদ্যুতের তারের ঘর্ষণজনিত স্ফুলিঙ্গ) অথবা গ্যাস লিকেজ থেকে এই দুর্ঘটনার সূত্রপাত হতে পারে।
কেরাণীগঞ্জের এই এলাকাটি ঘনবসতিপূর্ণ এবং এখানে অসংখ্য ছোট-বড় কারখানা রয়েছে। এর আগেও এই অঞ্চলে অগ্নিকাণ্ডের একাধিক ঘটনা ঘটেছে। আজকের এই মর্মান্তিক দুর্ঘটনায় এলাকায় শোকের ছায়া নেমে এসেছে। স্বজনহারা মানুষের আহাজারিতে ভারি হয়ে উঠেছে কদমতলীর বাতাস। স্থানীয় প্রশাসন ও পুলিশ বাহিনী ঘটনাস্থলে উপস্থিত থেকে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখার চেষ্টা করছে।
কেরাণীগঞ্জের এই অগ্নিকাণ্ড আবারও আমাদের শিল্পকারখানার অগ্নি নিরাপত্তা ব্যবস্থার দুর্বলতাকে সামনে নিয়ে এসেছে। একটি গ্যাস লাইটার তৈরির কারখানায় যেখানে দাহ্য পদার্থ মজুদ থাকে, সেখানে পর্যাপ্ত অগ্নিনির্বাপক ব্যবস্থা ও জরুরি বহির্গমন পথ থাকা বাধ্যতামূলক। বারবার একই ধরনের দুর্ঘটনায় প্রাণহানি ঘটলেও কারখানা মালিকদের অসচেতনতা এবং যথাযথ তদারকির অভাব অত্যন্ত উদ্বেগজনক। এই ঘটনার সুষ্ঠু তদন্তের পাশাপাশি দোষীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির আওতায় আনা জরুরি, যাতে ভবিষ্যতে এমন করুণ মৃত্যু আর দেখতে না হয়।