বিশ্বজুড়ে চলমান জ্বালানি সংকটের নেতিবাচক প্রভাব থেকে দেশকে সুরক্ষা দিতে শিক্ষা কার্যক্রমের ধরনে বড় ধরনের পরিবর্তনের সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার। এখন থেকে দেশের সকল শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে সপ্তাহে তিন দিন সরাসরি উপস্থিত থেকে এবং বাকি তিন দিন ইন্টারনেটের মাধ্যমে (অনলাইন) পাঠদান পরিচালিত হবে।
বৈশ্বিক জ্বালানি সংকটের কারণে সৃষ্ট বিদ্যুৎ ও তেলের ঘাটতি মোকাবিলায় সাশ্রয়ী নীতি অনুসরণের অংশ হিসেবে এই কঠোর পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে শিক্ষা মন্ত্রণালয়। মঙ্গলবার এক জরুরি বৈঠকে এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। মন্ত্রণালয়ের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, দেশের সব পর্যায়ের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে এখন থেকে সপ্তাহে তিন দিন সশরীরে উপস্থিত হয়ে শ্রেণি কার্যক্রম পরিচালিত হবে এবং সপ্তাহের বাকি তিন দিন শিক্ষার্থীরা নিজ নিজ বাসভবনে থেকে প্রযুক্তি ব্যবহার করে পাঠদান গ্রহণ করবে।
এর আগে শিক্ষামন্ত্রী বর্তমান পরিস্থিতির গুরুত্ব বিবেচনায় নিয়ে পাঠদান পদ্ধতিতে পরিবর্তনের ইঙ্গিত দিয়েছিলেন। তিনি জানিয়েছিলেন, বিশ্বব্যাপী জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধি এবং বিদ্যুৎ উৎপাদনের কাঁচামালের সংকটের কারণে স্কুল-কলেজ পর্যায়ে সরাসরি উপস্থিতি এবং প্রযুক্তিগত পদ্ধতির সমন্বয়ে একটি নতুন নিয়ম চালুর বিষয়ে নিবিড় আলোচনা চলছে। এই পরিবর্তনের মাধ্যমে একদিকে যেমন সরকারি যানবাহনের জ্বালানি সাশ্রয় হবে, অন্যদিকে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে বিদ্যুৎ ব্যবহারের চাপও অনেকাংশে কমে আসবে।
মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, এই নতুন প্রস্তাবনাটি আগামী বৃহস্পতিবার মন্ত্রিসভার (সরকারের সর্বোচ্চ নীতিনির্ধারণী পরিষদ) বৈঠকে আনুষ্ঠানিকভাবে উপস্থাপন করা হবে। সেখানে প্রধানমন্ত্রী ও অন্যান্য মন্ত্রীদের মতামতের ভিত্তিতে এর বাস্তবায়ন প্রক্রিয়া এবং বিস্তারিত সময়সূচি চূড়ান্ত করা হবে। সরকারের লক্ষ্য হলো শিক্ষার গুণগত মান বজায় রেখে কীভাবে জাতীয় সম্পদ তথা জ্বালানি সাশ্রয় করা যায়, তার একটি টেকসই সমাধান বের করা।
দেশের বর্তমান বিদ্যুৎ পরিস্থিতি ও বৈশ্বিক বাজারের অস্থিরতার প্রেক্ষাপটে এই সিদ্ধান্তকে অত্যন্ত সময়োপযোগী বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্ট মহলের একাংশ। তাদের মতে, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে যাতায়াতের জন্য প্রতিদিন যে বিপুল পরিমাণ ব্যক্তিগত ও গণপরিবহন ব্যবহৃত হয়, তিন দিন সশরীরে উপস্থিতি বন্ধ থাকলে সেই খাতে তেলের বড় ধরনের সাশ্রয় হবে। এছাড়া শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের বাতি, পাখা ও অন্যান্য বৈদ্যুতিক যন্ত্রপাতির ব্যবহার কমে আসায় জাতীয় গ্রিডের ওপর চাপও হ্রাস পাবে।
শিক্ষার্থীদের পড়াশোনার যাতে কোনো ক্ষতি না হয়, সেজন্য বিশেষ দিকনির্দেশনা তৈরি করছে মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তর। শিক্ষকরা যাতে ইন্টারনেটের মাধ্যমে ক্লাসগুলো প্রাণবন্ত এবং কার্যকর করতে পারেন, সেজন্য প্রয়োজনীয় কারিগরি সহায়তার বিষয়টিও গুরুত্বের সাথে দেখা হচ্ছে। তবে মফস্বল বা গ্রামাঞ্চলের শিক্ষার্থীরা প্রযুক্তিগত কোনো সমস্যার সম্মুখীন হবে কি না, তা নিয়েও সংশ্লিষ্ট দপ্তরে পরিকল্পনা চলছে।
সরকারের এই সাহসী পদক্ষেপ আপাতদৃষ্টিতে কেবল জ্বালানি সাশ্রয়ের কৌশল মনে হলেও, এটি আমাদের ভবিষ্যতের শিক্ষা ব্যবস্থাকে আধুনিকায়নের পথে নিয়ে যাওয়ার একটি বড় সুযোগ। তবে কেবল নীতি পরিবর্তন করলেই হবে না, বরং ইন্টারনেটের সহজলভ্যতা এবং নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত করা এই পদ্ধতির সাফল্যের প্রধান শর্ত। এই সংকটকে আমরা যদি ইতিবাচকভাবে গ্রহণ করে নতুন প্রযুক্তিতে দক্ষ হয়ে উঠতে পারি, তবে দীর্ঘমেয়াদে তা জাতির জন্যই মঙ্গল বয়ে আনবে। এখন দেখার বিষয়, মাঠ পর্যায়ে এই ব্যবস্থার বাস্তবায়ন কতটা সুচারুভাবে সম্পন্ন হয়।