জাতীয় নির্বাচনের ফলাফল ছিনতাই বা কুক্ষিগত করা হলেও জনগণের দেওয়া গণভোটের রায় যেকোনো মূল্যে বাস্তবায়ন করার ঘোষণা দিয়েছেন বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর আমির ও সংসদের বিরোধী দলীয় নেতা ডা. শফিকুর রহমান। তিনি অভিযোগ করেন, বর্তমান সরকার সংসদে সংখ্যাগরিষ্ঠতার দাপট দেখিয়ে ফ্যাসিবাদী আচরণ করছে।
সোমবার দুপুরে জাতীয় প্রেস ক্লাবে ‘জাতীয় গণতান্ত্রিক পার্টি’ (জাগপা)-এর ৪৬তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষে আয়োজিত এক আলোচনা সভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন। বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতি এবং সংসদের কার্যকারিতা নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করে ডা. শফিকুর রহমান বলেন, ছাত্র-জনতার ঐতিহাসিক অভ্যুত্থান কেবল ব্যক্তি পরিবর্তনের জন্য ছিল না, বরং এটি ছিল একটি পুরো ফ্যাসিবাদী কাঠামো বা ব্যবস্থার বিরুদ্ধে। কিন্তু দুর্ভাগ্যজনকভাবে একটি পক্ষ জাতীয় নির্বাচনের ফলাফলকে নিজেদের নিয়ন্ত্রণে নিয়ে নিয়েছে।
বিরোধী দলীয় নেতা স্পষ্ট হুশিয়ারি দিয়ে বলেন, "আমরা রাজপথ থেকে উঠে আসা দল। যেকোনো মূল্যে গণভোটের রায়কে আমরা আদায় করেই ছাড়ব। এই নতুন প্রজন্ম ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে সব সময় সজাগ রয়েছে। তাদের সঙ্গে নিয়ে যেকোনো অন্যায়ের বিরুদ্ধে আমাদের লড়াই চলবে।" তিনি আরও উল্লেখ করেন যে, জুলাই সনদ (বিপ্লবোত্তর জাতীয় অঙ্গীকারনামা) এবং রাষ্ট্র সংস্কারের যে স্বপ্ন তরুণরা দেখেছিল, তা বাস্তবায়নে কোনো আপস করা হবে না।
সংসদের ভেতরে বিরোধী দলের কণ্ঠরোধ করা হচ্ছে দাবি করে ডা. শফিকুর রহমান বলেন, বর্তমানে দেশে তীব্র জ্বালানি সংকট ও হাম সংক্রমণের মতো জনস্বাস্থ্য ঝুঁকি বিদ্যমান। এসব জরুরি বিষয়ে কথা বলতে গেলে সংসদে তাদের মুখ বন্ধ করে দেওয়া হয়। বিরোধী দলের পক্ষ থেকে দেওয়া কোনো ‘মুলতবি প্রস্তাব’ (জরুরি আলোচনার জন্য সংসদের নিয়মিত কাজ স্থগিতের আবেদন) গ্রহণ করা হয় না। সরকারের পক্ষ থেকে দাবি করা হচ্ছে জ্বালানি সংকট নেই, অথচ বাস্তব চিত্র তুলে ধরে তিনি বলেন, “আমি সংসদ সদস্য ও বিরোধী দলীয় নেতা হওয়া সত্ত্বেও নিজের গাড়ির জন্য প্রয়োজনমতো জ্বালানি তেল পাচ্ছি না। সাধারণ মানুষের অবস্থা তাহলে কতটা শোচনীয়, তা সহজেই অনুমেয়।”
প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর এই অনুষ্ঠানে বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের শীর্ষ নেতৃবৃন্দ ছাড়াও দেশের বরেণ্য কবি, সাহিত্যিক ও সুশীল সমাজের প্রতিনিধিরা অংশ নেন। বক্তারা জুলাই সনদ বাস্তবায়ন এবং রাষ্ট্র সংস্কারের প্রয়োজনীয়তার ওপর গুরুত্বারোপ করেন। তারা সরকারকে সতর্ক করে বলেন, সংসদের ভেতরে অভ্যুত্থানের চেতনাকে অবজ্ঞা করলে তার পরিণাম শুভ হবে না।
বিরোধী দলীয় নেতার এই বক্তব্য দেশের রাজনীতিতে এক গভীর সংকটের ইঙ্গিত দিচ্ছে। সংসদীয় গণতন্ত্রে যখন বিরোধী দলের কথা বলার সুযোগ সংকুচিত হয়, তখন রাজপথের আন্দোলন অনিবার্য হয়ে ওঠে। জ্বালানি সংকটের মতো মৌলিক সমস্যাগুলো অস্বীকার না করে সরকারের উচিত বাস্তবমুখী পদক্ষেপ নেওয়া। গণভোটের রায় এবং জুলাই সনদের আকাঙ্ক্ষা ধারণ করা কেবল বিরোধী দলের দায়িত্ব নয়, বরং এটি রাষ্ট্রের স্থিতিশীলতার জন্য সরকারি দলেরও বড় দায়বদ্ধতা। জনরোষ এড়াতে আলোচনার পথ খোলা রাখাই এখন বুদ্ধিমানের কাজ হবে।