উত্তরবঙ্গের অন্যতম প্রধান চিকিৎসা সেবা কেন্দ্র রংপুর মেডিকেল কলেজ (রমেক) হাসপাতালে হামের লক্ষণ নিয়ে পাঁচজন শিশুকে ভর্তি করা হয়েছে। আক্রান্ত শিশুদের সুচিকিৎসা নিশ্চিত করতে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ ইতিমধ্যে পাঁচ সদস্যের একটি বিশেষ বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক দল গঠন করেছে।
রংপুর ও আশপাশের জেলাগুলোতে শিশুদের মধ্যে হামের মতো সংক্রামক ব্যাধির প্রকোপ দেখা দেওয়ায় জনমনে কিছুটা উদ্বেগের সৃষ্টি হয়েছে। রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল সূত্রে জানা গেছে, গত এক সপ্তাহ ধরে বিভিন্ন এলাকা থেকে হামের উপসর্গ নিয়ে শিশুরা হাসপাতালে আসতে শুরু করেছে। মঙ্গলবার দুপুর পর্যন্ত পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে হাসপাতালে মোট পাঁচজন শিশু চিকিৎসাধীন রয়েছে।
হাসপাতালের পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল আশিকুর রহমান ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত করে জানিয়েছেন, ভর্তি হওয়া শিশুদের অবস্থা নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে। সংক্রমণের ঝুঁকি এড়াতে তাদের হাসপাতালের সাধারণ ওয়ার্ডে না রেখে বিশেষ 'বিচ্ছিন্নকরণ ইউনিটে' (আইসোলেশন ওয়ার্ড) রাখা হয়েছে। তিনি আরও জানান, যদি রোগীর সংখ্যা আরও বৃদ্ধি পায়, তবে পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার জন্য হাসপাতালের পক্ষ থেকে সব ধরনের আগাম প্রস্তুতি গ্রহণ করা হয়েছে। উন্নত চিকিৎসার স্বার্থে পাঁচ সদস্যের যে মেডিকেল টিম বা চিকিৎসক দল গঠন করা হয়েছে, তারা সার্বক্ষণিকভাবে এই শিশুদের দেখভাল করছেন।
হাসপাতাল থেকে প্রাপ্ত তথ্যানুযায়ী, আক্রান্ত শিশুদের মধ্যে গত ২৩ মার্চ লালমনিরহাট সদর উপজেলার আব্দুস সালামের আট মাস বয়সী কন্যা আমাতুল্লাহ জান্নাত প্রথম ভর্তি হয়। এরপর ২৫ মার্চ দিনাজপুর জেলার পার্বতীপুর থেকে আসা রণজিৎ রায়ের সাত মাস বয়সী শিশু প্রজ্ঞা রায়কে হাসপাতালে নেওয়া হয়। গত ২৯ মার্চ গাইবান্ধার সুন্দরগঞ্জ উপজেলার মো. আলামিনের দুই বছরের পুত্র আরাফাত এবং একই দিনে রংপুর মহানগরীর তাজহাট এলাকার সোহাগ আহম্মেদের নয় মাস বয়সী শিশু সাইয়েম আহম্মেদকে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে। শিশুদের শরীরে হামের প্রাথমিক লক্ষণ যেমন—তীব্র জ্বর, শরীরে লালচে দানা বা ফুসকুড়ি দেখা দেওয়ায় অভিভাবকরা তাদের হাসপাতালে নিয়ে আসেন।
চিকিৎসকরা জানিয়েছেন, ভর্তি হওয়া এই শিশুদের প্রত্যেকের শরীর থেকে নমুনা সংগ্রহ করা হয়েছে এবং তা পরীক্ষার জন্য রাজধানীর কেন্দ্রীয় গবেষণাগারে পাঠানো হয়েছে। পরীক্ষার ফলাফল হাতে এলেই নিশ্চিত হওয়া যাবে যে তারা আসলে হামে আক্রান্ত কি না। তবে প্রতিবেদন আসার আগ পর্যন্ত তাদের অত্যন্ত সতর্কতার সাথে বিশেষ ব্যবস্থায় চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে।
এদিকে রংপুরের উপ-সিভিল সার্জন চিকিৎসক ফিরোজ জানিয়েছেন, মাঠ পর্যায়েও পরিস্থিতির ওপর কড়া নজরদারি রাখা হচ্ছে। তিনি জানান, আজ পর্যন্ত জেলার বিভিন্ন প্রান্ত থেকে মোট ১৯ জন শিশুর নমুনা সংগ্রহ করে পরীক্ষার জন্য ঢাকায় পাঠানো হয়েছে। তবে স্বস্তির বিষয় হলো, এখন পর্যন্ত কারো শরীরেই হামের ভাইরাসের উপস্থিতি শনাক্ত হয়নি। তিনি আরও জানান, আবহাওয়া পরিবর্তনের এই সময়ে শিশুদের মাঝে এমন চর্মরোগ বা জ্বরের প্রকোপ দেখা দিতে পারে। তাই কোনো শিশু অসুস্থ হলে ভয় না পেয়ে বা গ্রাম্য কবিরাজি চিকিৎসার ওপর নির্ভর না করে সরাসরি নিকটস্থ সরকারি হাসপাতালে নেওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন তিনি।
বর্তমান সময়ে আবহাওয়া পরিবর্তনের প্রভাবে শিশুদের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কমে যায়, যার ফলে হাম বা বসন্তের মতো রোগের প্রাদুর্ভাব দেখা দেওয়া অস্বাভাবিক নয়। তবে সঠিক সময়ে সরকারি টিকা প্রদান এবং সচেতনতা এই রোগ প্রতিরোধে কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে। রংপুর মেডিকেলে শিশুদের এই ভর্তি হওয়া আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে, শিশুদের স্বাস্থ্য সুরক্ষায় নিয়মিত টিকাদান কর্মসূচির গুরুত্ব কতটা অপরিসীম। অভিভাবকদের উচিত আতঙ্কিত না হয়ে শিশুদের পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন রাখা এবং যেকোনো শারীরিক অসংগতি দেখা দিলে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া। স্বাস্থ্য বিভাগের উচিত মাঠ পর্যায়ে টিকার আওতার বাইরে থাকা শিশুদের খুঁজে বের করা এবং জনসচেতনতা বৃদ্ধিতে কাজ করা।