বিশ্বকাপ ফাইনালের হার মেনে নিতে পারেননি আর্জেন্টিনা ফুটবল দলের প্রধান প্রশিক্ষক (কোচ) লিওনেল স্কালোনি। ম্যাচ পরবর্তী সংবাদ সম্মেলনে কথা বলতে বলতে বারবার আবেগাপ্লুত হয়ে পড়ছিলেন তিনি। গাল বেয়ে গড়িয়ে পড়ছিল অশ্রু। একপর্যায়ে কান্নার দমকে নিজের আবেগ ধরে রাখতে না পেরে মাঝপথেই চেয়ার ছেড়ে উঠে যান তিনি। উপস্থিত ক্রীড়া সাংবাদিকেরা তুমুল করতালির মাধ্যমে এই সফলতম কোচকে বিদায়ী সম্মান জানান। তবে চলে যাওয়ার আগে নিজের ভবিষ্যৎ এবং দায়িত্ব চালিয়ে যাওয়া নিয়ে বড় ধরণের সংশয়ের কথা জানিয়ে গেছেন তিনি।
মাঠে লিওনেল স্কালোনিকে সবসময় অত্যন্ত শান্ত ও ধীরস্থির স্বভাবের দেখা যায়। সাফল্য কিংবা ব্যর্থতা—কোনো কিছুতেই তিনি অতিরিক্ত প্রতিক্রিয়া দেখান না। কিন্তু এবারের ফাইনালে ডাগআউটে (খেলোয়াড় ও প্রশিক্ষকদের বসার জায়গা) তাকে দেখা গেছে সম্পূর্ণ ভিন্ন রূপে। প্রতি মুহূর্তের উত্তেজনায় মেজাজ হারিয়েছেন, চিৎকার করেছেন এবং একপর্যায়ে রেফারির আচরণে ক্ষুব্ধ হয়ে হলুদ কার্ডও দেখেছেন। হারের পর সেই ক্ষোভ রূপ নেয় চরম বিষাদে।
সংবাদ সম্মেলনে ভাঙা মন নিয়ে স্কালোনি বলেন, “আমার চুক্তির মেয়াদ আগামী ডিসেম্বরে শেষ হবে। আমি ফুটবল ফেডারেশনের সভাপতির সাথে কথা বলব। এই দল নিয়ে সামনে কী করা যায়, তা নিয়ে আমার নিজস্ব কিছু ভাবনা রয়েছে। তবে আমাদের একটু থামানো এবং গভীরভাবে ভাবা প্রয়োজন। কারণ আমি নিশ্চিত নই যে, এত বড় সাফল্য পুনরায় অর্জন করা আমাদের পক্ষে সম্ভব হবে কি না। ফেডারেশনের সভাপতি আমাকে যে সুযোগ দিয়েছেন, তার জন্য আমি কৃতজ্ঞ। আমাদের কোচিং স্টাফ এবং ফুটবলাররা শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত নিজেদের উজাড় করে দিয়েছিল।”
অথচ ২০১৮ সালে স্কালোনির আর্জেন্টিনা দলের কোচ হওয়াটা ছিল চরম নাটকীয়তায় ভরা। রাশিয়া বিশ্বকাপের শেষ ষোলো থেকে বিদায় নেওয়ার পর আনকোরা এই সাবেক ফুটবলারকে যখন অন্তর্বর্তীকালীন কোচের দায়িত্ব দেওয়া হয়, তখন দেশটির ফুটবল মহলে সমালোচনার ঝড় উঠেছিল। ফুটবলের কিংবদন্তি ডিয়েগো মারাদোনা তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেছিলেন, “এই লোক এমনকি ট্র্যাফিকও নিয়ন্ত্রণ করতে পারবে না, তাকে দেওয়া হয়েছে জাতীয় দলের দায়িত্ব!”
কিন্তু সময়ের সাথে সাথে সব সমালোচনাকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে আর্জেন্টিনার ইতিহাসের অন্যতম সফল প্রশিক্ষক হিসেবে নিজেকে প্রমাণ করেছেন স্কালোনি। তার অধীনে আলবিসেলেস্তেরা (আর্জেন্টিনা দল) দীর্ঘ ২৮ বছরের ট্রফি খরা কাটিয়ে ২০২১ সালে কোপা আমেরিকা জয় করে। এরপর ৩৬ বছরের অপেক্ষা ঘুচিয়ে ২০২২ সালে ঘরে তোলে পরম কাঙ্ক্ষিত বিশ্বকাপ। এমনকি ২০২৪ সালেও ধরে রাখে কোপা আমেরিকার শ্রেষ্ঠত্ব।
ডিসেম্বরে চুক্তি শেষ হওয়ার পর স্কালোনি যদি দায়িত্ব চালিয়ে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেন, তবে তার সামনে অপেক্ষা করছে এক নতুন চ্যালেঞ্জ। ৩৯ বছর বয়সী মহাতারকা লিওনেল মেসির ক্যারিয়ারের শেষ সময় ঘনিয়ে এসেছে। ২০২২ ও ২০২৬ সালের উভয় ফাইনালে একাদশে থাকা ৮ জন প্রধান ফুটবলারের বয়স এখন থাবা বসিয়েছে পারফরম্যান্সে। ফলে নতুন করে দল সাজানোর সেই কঠিন চ্যালেঞ্জ নেওয়ার আগে স্কালোনি হয়তো বিশ্রামের কথাই ভাবছেন। আবেগঘন কণ্ঠে সমর্থকদের ধন্যবাদ জানিয়ে তিনি বলেন, “আমি কখনও ভাবিনি আমরা এই উচ্চতায় পৌঁছাব। তবে বিদায় নেওয়া কিংবা নতুন করে শুরু করার সিদ্ধান্ত নেওয়া সত্যিই বেদনাদায়ক।”