বাংলাদেশ ও আন্তর্জাতিক অঙ্গনে চিকিৎসাশাস্ত্রে অসামান্য অবদানের জন্য সমাদৃত ব্যক্তিত্ব, একুশে পদকপ্রাপ্ত প্রবীণ চিকিৎসক অধ্যাপক ডা. এ বি এম আবদুল্লাহর ইমেরিটাস (আজীবন সম্মানসূচক) অধ্যাপক পদ বাতিল করেছে বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় (বিএমইউ)। একই সঙ্গে এই পদ বাবদ উত্তোলিত সব বেতন-ভাতা ফেরত দেওয়ার নির্দেশ দিয়েছে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ। জীবনের শেষ প্রান্তে এসে বিশ্ববিদ্যালয়ের এমন আকস্মিক সিদ্ধান্তে গভীর ক্ষোভ, বিস্ময় এবং সামাজিক অবমাননার তীব্র যন্ত্রণা প্রকাশ করেছেন এই বিশিষ্ট চিকিৎসক।
সম্প্রতি প্রকাশিত বিশ্ববিদ্যালয়ের এক দাপ্তরিক আদেশে এই তথ্য জানানো হয়। এতে বলা হয়, ২০২৪ সালের ২০ জুন অনুষ্ঠিত সিন্ডিকেটের (বিশ্ববিদ্যালয়ের সর্বোচ্চ নীতি-নির্ধারণী পর্ষদ) ৯২তম বাজেট সভায় আলোচ্যসূচির বাইরে গিয়ে এক সদস্যের প্রস্তাবের ভিত্তিতে ইমেরিটাস অধ্যাপক নিয়োগের নীতিমালা সংশোধন করা হয়। ওই সভাতেই ডা. এ বি এম আবদুল্লাহকে আজীবন মেয়াদে ইমেরিটাস অধ্যাপক হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়েছিল। তবে পরবর্তী সময়ে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ জানায়, নীতিমালার বাইরে গিয়ে এই নিয়োগ দেওয়া হয়েছিল, যা বিধিসম্মত নয়। এর পরিপ্রেক্ষিতেই তার এই নিয়োগ বাতিল করা হয়েছে এবং সভার দিন থেকে এ পর্যন্ত নেওয়া সব আর্থিক সুবিধা ফেরত দিতে বলা হয়েছে।
বিশ্ববিদ্যালয়ের এই সিদ্ধান্তকে ‘সম্পূর্ণ অন্যায়, অযৌক্তিক ও উদ্দেশ্যপ্রণোদিত’ হিসেবে আখ্যা দিয়েছেন অধ্যাপক ডা. এ বি এম আবদুল্লাহ। তিনি বলেন, দীর্ঘ ৫০ বছরের চিকিৎসা জীবনে তিনি সর্বদা সততা ও নিষ্ঠার সঙ্গে মানুষকে সেবা দিয়ে গেছেন। নিজের সততা ও মেধার স্বীকৃতি হিসেবে দেশে-বিদেশে অসংখ্য সম্মাননা পেয়েছেন। তার ইমেরিটাস পদ বাতিলের এই ঘটনাকে তিনি কেবল একটি দাপ্তরিক সিদ্ধান্ত হিসেবে দেখছেন না, বরং এটি তার গৌরবময় কর্মজীবনের ওপর এক ধরনের আঘাত বলে মনে করছেন।
অধ্যাপক আবদুল্লাহ বলেন, "আমি আমার দীর্ঘ কর্মজীবনে ইউজিসি (বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন) পুরস্কার এবং রাষ্ট্রীয় সর্বোচ্চ বেসামরিক সম্মাননা ‘একুশে পদক’সহ অন্তত ১৪-১৫টি আন্তর্জাতিক ও একাডেমিক পদক পেয়েছি। চিকিৎসাবিজ্ঞানের বিশ্বখ্যাত এবং আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত আকর গ্রন্থ ‘ডেভিডসন’ এবং ‘কুমার অ্যান্ড ক্লার্ক’-এর আন্তর্জাতিক উপদেষ্টা বোর্ডের সদস্য হিসেবে দীর্ঘকাল দায়িত্ব পালন করেছি। বিশ্বের বা বাংলাদেশের ইতিহাসে কোনো বিশ্ববিদ্যালয়ের ইমেরিটাস অধ্যাপকের মতো আজীবন সম্মানসূচক নিয়োগ বাতিলের এমন নজির আর একটিও নেই।"
আর্থিক বিষয়ের চেয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের পক্ষ থেকে আসা এই আচরণ তাকে সবচেয়ে বেশি ব্যথিত করেছে উল্লেখ করে তিনি জানান, ইমেরিটাস পদের জন্য নির্ধারিত আর্থিক সুবিধা খুবই সামান্য ছিল, যা ছিল মাসিক আনুমানিক ২০ থেকে ২৫ হাজার টাকা। তিনি মনে করেন, এর উদ্দেশ্য অর্থ পুনরুদ্ধার নয়, বরং তাকে সামাজিকভাবে হেয় প্রতিপন্ন করা। দীর্ঘকাল ধরে তিল তিল করে অর্জিত সম্মানকে এভাবে প্রশ্নবিদ্ধ করায় দেশের চিকিৎসা সমাজেও তীব্র প্রতিক্রিয়া ও উদ্বেগের সৃষ্টি হয়েছে।
চিকিৎসা অঙ্গনের বিশ্লেষকদের মতে, ইমেরিটাস অধ্যাপকের মতো উচ্চ সম্মানিত পদ সাধারণত বিশ্ববিদ্যালয়ের খ্যাতিমান প্রবীণ শিক্ষকদের অবদানের স্বীকৃতি হিসেবে দেওয়া হয়। দেশের কোনো শীর্ষস্থানীয় চিকিৎসকের ক্ষেত্রে এমন সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে আরও সংবেদনশীল ও গঠনমূলক প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে যাওয়া উচিত ছিল। নিয়ম সংশোধন বা প্রশাসনিক জটিলতা যদি থেকেও থাকে, তবে সম্মানীয় একজন মানুষের আত্মমর্যাদা ক্ষুণ্ন না করে তা সমাধান করা সম্ভব ছিল।