বিশ্ব ফুটবলের অন্যতম শক্তিশালী দেশ ইতালি টানা তৃতীয়বারের মতো ফুটবল মহোৎসবে জায়গা করে নিতে ব্যর্থ হয়েছে। এই চরম বিপর্যয় কেবল একটি টুর্নামেন্ট থেকে ছিটকে পড়া নয়, বরং ইতালীয় ফুটবলের অভ্যন্তরে বাসা বাঁধা দীর্ঘদিনের কাঠামোগত ও আর্থিক সংকটের কঙ্কালসার রূপটিই বিশ্ববাসীর সামনে উন্মোচিত করেছে।
ইতালীয় ফুটবলের এই ঐতিহাসিক পতনের পর দেশটির ফুটবল ফেডারেশনের প্রধান গ্যাব্রিয়েলে গ্রাভিনা তার পদ থেকে ইস্তফা দিয়েছেন। পদত্যাগের পাশাপাশি তিনি একটি বিস্তারিত প্রতিবেদন পেশ করেছেন, যেখানে নীল জার্সিধারীদের ফুটবলের বর্তমান দুরাবস্থার করুণ চিত্র ফুটে উঠেছে। তার ভাষ্যমতে, ইতালির ফুটবল আজ এমন এক ক্রান্তিলগ্নে দাঁড়িয়ে, যেখান থেকে ঘুরে দাঁড়াতে হলে পুরো ব্যবস্থার আমূল পরিবর্তন প্রয়োজন।
গ্রাভিনার প্রতিবেদনে উঠে আসা সবচেয়ে বড় উদ্বেগের নাম হলো বিশাল আর্থিক লোকসান। ইতালীয় ফুটবল ব্যবস্থা প্রতি বছর আনুমানিক ৭৩০ মিলিয়ন ইউরোরও (ইউরোপীয় অঞ্চলের প্রচলিত মুদ্রা) বেশি আর্থিক ক্ষতির সম্মুখীন হচ্ছে। এই বিপুল ঋণের বোঝা ও রাজস্বের অভাব সরাসরি প্রভাব ফেলছে নতুন প্রতিভা অন্বেষণ এবং স্টেডিয়ামসহ অন্যান্য অবকাঠামোগত উন্নয়নের ওপর। দীর্ঘমেয়াদি কোনো পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করার মতো আর্থিক সক্ষমতা বর্তমান ইতালীয় ক্লাবগুলোর নেই বললেই চলে।
আরেকটি ভয়াবহ সত্য হলো ইতালির ঘরোয়া লিগগুলোতে স্থানীয় ফুটবলারদের কদর কমে যাওয়া। 'সিরি আ' বা ইতালির শীর্ষ লিগে বিদেশি খেলোয়াড়দের আধিক্য এতটাই বেড়েছে যে, উদীয়মান স্থানীয় ফুটবলাররা নিজেদের প্রমাণের নূন্যতম সুযোগটুকুও পাচ্ছেন না। ফলে জাতীয় দলের জন্য শক্তিশালী পাইপলাইন তৈরি হচ্ছে না। গ্রাভিনা তথ্য দিয়েছেন যে, যুব উন্নয়নের ক্ষেত্রে বিশ্বের শীর্ষ ৫০টি লিগের তালিকায় ইতালি বর্তমানে সর্বশেষ অবস্থানে রয়েছে। এমনকি অনূর্ধ্ব-২১ (একুশ বছরের কম বয়সী) খেলোয়াড়দের মাঠে নামানোর সময়ের দিক দিয়েও তাদের অবস্থান ৪৯তম, যা একটি ফুটবল পরাশক্তির জন্য অত্যন্ত লজ্জাজনক।
খেলার কৌশলগত দিক নিয়েও গ্রাভিনা কড়া সমালোচনা করেছেন। তিনি মনে করেন, ইতালির ফুটবলে আগের সেই আগ্রাসন, গতি এবং প্রতিপক্ষকে চাপে রাখার সহজাত ক্ষমতা হারিয়ে গেছে। বর্তমান জাতীয় দলের খেলায় এক ধরনের স্থবিরতা কাজ করছে, যা আধুনিক ফুটবলের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।
এই সংকট থেকে উত্তরণের পথ হিসেবে সাবেক এই ফেডারেশন প্রধান কিছু সুনির্দিষ্ট প্রস্তাবনা রেখে গেছেন। তিনি মনে করেন, ক্লাবগুলো যদি তাদের নিজস্ব শিক্ষাকেন্দ্র বা একাডেমিতে বড় অংকের বিনিয়োগ করে, তবে সরকারকে তাদের কর ছাড় দেওয়া উচিত। এছাড়া বিদেশি বিনিয়োগ ও দক্ষ খেলোয়াড় আকর্ষণে নিয়মনীতি সহজ করা এবং জুয়া বা বাজি ধরা কোম্পানিগুলোর পৃষ্ঠপোষকতা থেকে আয়ের নতুন উৎস তৈরির ওপর তিনি জোর দিয়েছেন।
নীল জার্সিধারীদের এই ধারাবাহিক ব্যর্থতা আমাদের একটি কঠিন শিক্ষা দেয়—কেবল ঐতিহ্য দিয়ে ফুটবলের রাজত্ব ধরে রাখা সম্ভব নয়। আধুনিক ফুটবলে বিনিয়োগ, পরিকল্পিত যুব উন্নয়ন এবং স্থানীয় প্রতিভাকে অগ্রাধিকার দেওয়ার কোনো বিকল্প নেই। ইতালির ফুটবল যদি এখনই তাদের ভুলগুলো শুধরে না নেয়, তবে আগামী দিনে বিশ্ব মানচিত্র থেকে তাদের চিরচেনা দাপট হারিয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা প্রবল। ফুটবলের নান্দনিকতা ফিরে পেতে ইতালির পুনর্জন্ম এখন সময়ের দাবি।