দক্ষিণ এশীয় ফুটবলের সবচাইতে মর্যাদাপূর্ণ আসর 'নারী সাফ চ্যাম্পিয়নশিপে' অংশ নিতে পারছে না পাকিস্তান নারী ফুটবল দল। মাঠের লড়াই শুরুর আগেই মাঠের বাইরের রাজনৈতিক জটিলতায় কপাল পুড়ল দলটির। ভারতের সঙ্গে দীর্ঘস্থায়ী ভূ-রাজনৈতিক উত্তেজনার জেরে পাকিস্তান সরকার তাদের জাতীয় নারী দলকে ভারত সফরের অনুমতি না দেওয়ায় এই পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। ফলে এবারের আঞ্চলিক শ্রেষ্ঠত্বের লড়াইয়ে প্রতিবেশী দেশটিকে ছাড়াই চূড়ান্ত সূচি প্রকাশ করেছে আয়োজক কর্তৃপক্ষ।
পাকিস্তান ফুটবল ফেডারেশনের (পিএফএফ) কর্মকর্তারা আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমগুলোকে জানিয়েছেন, ভারতের মাটিতে পা রাখার জন্য যে অনাপত্তি পত্র (সরকারের বিশেষ অনুমতিপত্র) প্রয়োজন ছিল, তা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ প্রদান করেনি। দুই প্রতিবেশী দেশের মধ্যকার বৈরী সম্পর্কের কারণে দীর্ঘদিন ধরেই ক্রীড়াবিদদের পারস্পরিক যাতায়াত কার্যত বন্ধ রয়েছে। এবারের ঘটনাটি সেই শীতল সম্পর্কেরই এক নতুন দৃষ্টান্ত হিসেবে দেখা হচ্ছে। আগামী ২৫ মে থেকে ৭ জুন পর্যন্ত ভারতের পর্যটন নগরী গোয়ায় বসতে যাচ্ছে নারী ফুটবলের এই মহোৎসব। দক্ষিণ এশীয় ফুটবল ফেডারেশনের (সাফ) সদস্য হওয়া সত্ত্বেও মাঠের লড়াইয়ে দেখা যাবে না সবুজ জার্সিধারীদের।
ফুটবল অঙ্গনে এই অনুপস্থিতির প্রভাব পড়ছে টুর্নামেন্টের বিন্যাসেও। বুধবার সাফ কর্তৃপক্ষ পাকিস্তানকে বাদ দিয়েই ছয়টি দল নিয়ে নতুন ক্রীড়াসূচি ঘোষণা করেছে। নতুন এই বিন্যাসে গ্রুপ 'এ'-তে স্থান পেয়েছে নেপাল, ভুটান ও শ্রীলঙ্কা। অন্যদিকে গ্রুপ 'বি'-তে বর্তমান চ্যাম্পিয়ন বাংলাদেশের সঙ্গী হয়েছে ভারত ও মালদ্বীপ। গোয়ার পণ্ডিত জওহরলাল নেহরু স্টেডিয়ামে এই খেলাগুলো অনুষ্ঠিত হবে। উল্লেখ্য, এই মাঠেই এর আগে পুরুষদের সাফের আসরও অত্যন্ত জাঁকজমকপূর্ণভাবে সম্পন্ন হয়েছিল।
ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যকার ৭৮ বছরের পুরনো বৈরিতা কেবল সীমান্তেই সীমাবদ্ধ থাকেনি, তা বিষফোঁড়া হয়ে দাঁড়িয়েছে ক্রীড়াক্ষেত্রেও। ২০২৫ সালের মে মাসে দুই দেশের মধ্যে ভয়াবহ সীমান্ত সংঘর্ষের পর পরিস্থিতি আরও জটিল রূপ নেয়।
ভারতের যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয় গত বছর একটি নীতি ঘোষণা করে, যেখানে দ্বিপাক্ষিক ইভেন্টে একে অপরের দেশে যাতায়াত নিষিদ্ধ করা হয়। বহুজাতিক আসরে নিরপেক্ষ ভেন্যুতে দুই দেশ একে অপরের বিপক্ষে খেললেও, আয়োজক দেশ ভারত বা পাকিস্তান হলে জটিলতা যেন পিছু ছাড়ছে না। দক্ষিণ এশিয়ান ফুটবল ফেডারেশন এমন এক সময়ে এই সূচি প্রকাশ করেছে, যা কাকতালীয়ভাবে সাম্প্রতিক এক সীমান্ত হামলার বার্ষিকীর সঙ্গে মিলে গেছে, যা এই উত্তাপকে আরও উসকে দিয়েছে।
২০১০ সাল থেকে শুরু হওয়া এই টুর্নামেন্টের গত আসর বসেছিল নেপালের কাঠমান্ডুতে। সেখানে হিমালয় কন্যাদের হারিয়ে টানা দ্বিতীয়বারের মতো শিরোপা উঁচিয়ে ধরেছিল বাংলাদেশের মেয়েরা। ২০২৪ সালের সেই আসরে পাকিস্তান অংশগ্রহণ করলেও তারা গ্রুপ পর্ব থেকেই বিদায় নিয়েছিল। ২০১৪ সালে পাকিস্তান নিজেই এই আসরের সফল আয়োজক ছিল। ২০১৬ সালে পশ্চিমবঙ্গে আয়োজনের পর এবারই দ্বিতীয়বারের মতো ভারত এই প্রতিযোগিতার দায়িত্ব পেয়েছে, তবে রাজনৈতিক বেড়াজালে প্রতিবেশী প্রতিপক্ষকে ছাড়াই তাদের শুরু করতে হচ্ছে এই আসর।
খেলাধুলা সবসময়ই দেশগুলোর মধ্যে সেতুবন্ধন হিসেবে কাজ করে। কিন্তু দক্ষিণ এশিয়ায় রাজনীতি আর ক্রীড়া যেভাবে একে অপরের সঙ্গে জড়িয়ে পড়েছে, তাতে বারবার ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে ফুটবলারদের ক্যারিয়ার। মাঠের লড়াই কেন রাজনীতির শিকার হবে—এই প্রশ্ন এখন ফুটবল অনুরাগীদের মনে বড় হয়ে দেখা দিয়েছে। এশিয়ান ফুটবলের উন্নতির জন্য প্রতিবেশী দেশগুলোর মধ্যে পারস্পরিক ক্রীড়া যোগাযোগ পুনরায় স্থাপন করা এখন সময়ের দাবি।