বিগত তিন মাসেরও বেশি সময় ধরে সারা দেশে এক চরম আতঙ্ক ছড়িয়ে যাচ্ছে শিশুদের অতি পরিচিত কিন্তু ভয়ংকর সংক্রামক রোগ হাম। সরকারি ও বেসরকারি পর্যায়ে নানা উদ্যোগ এবং দেশব্যাপী টিকাদান কর্মসূচি জোরদার করার পরও কোনোভাবেই নিয়ন্ত্রণে আসছে না এই প্রাণঘাতী রোগটি। প্রতিদিনই দেশের কোথাও না কোথাও চিকিৎসারত অবস্থায় মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়ছে ফুটফুটে শিশুরা, যা জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের চরম ভাবনায় ফেলেছে।
শনিবার (২০ জুন) স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের দেওয়া সর্বশেষ নিয়মিত প্রতিবেদন থেকে এই ভয়ংকর পরিস্থিতির বাস্তব চিত্র উঠে এসেছে। সরকারি হিসাব অনুযায়ী, গত ২৪ ঘণ্টায় সারা দেশে হাম ও হামের উপসর্গ নিয়ে নতুন করে আরও ৭ জন শিশুর মর্মান্তিক মৃত্যু হয়েছে। এর মধ্যে শুধু রাজধানী ঢাকাতেই মারা গেছে ৬ জন শিশু। একই সময়ে দেশজুড়ে হামের উপসর্গ নিয়ে নতুন করে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে বা আক্রান্ত হিসেবে শনাক্ত হয়েছে ৮৮৭ জন।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্যমতে, গত ১৫ মার্চ থেকে শুরু করে ২০ জুন সকাল ৮টা পর্যন্ত দেশজুড়ে হাম এবং এর উপসর্গ নিয়ে সর্বমোট ৬৭৭ জন শিশুর প্রাণহানি ঘটেছে। এই বিপুলসংখ্যক মৃত্যুর মধ্যে চিকিৎসকদের নিবিড় পরীক্ষায় নিশ্চিতভাবে হামে আক্রান্ত হয়ে মারা গেছে ৯৩ জন শিশু। বাকি ৫৮৪ জন শিশু হামের সুস্পষ্ট উপসর্গ নিয়ে মারা গেছে।
শুধু মৃত্যু নয়, আক্রান্তের সংখ্যাও রীতিমতো উদ্বেগজনক। গত তিন মাসের এই নির্দিষ্ট সময়ে স্বাস্থ্য বিভাগের ল্যাবরেটরি (পরীক্ষাগার) পরীক্ষায় নিশ্চিতভাবে হামে আক্রান্ত হয়েছে ১০ হাজার ৯৪৯ জন রোগী। অন্যদিকে, জ্বর, কাশি ও শরীরে লালচে দাগের মতো হামের উপসর্গ নিয়ে বিভিন্ন সরকারি-বেসরকারি হাসপাতালে চিকিৎসার জন্য এসেছে ৯১ হাজার ৭৮৯ জন শিশু। হাসপাতালগুলোর শিশু ওয়ার্ডে এখন তিল ধারণের ঠাঁই নেই। চরম উদ্বেগ আর উৎকণ্ঠা নিয়ে অভিভাবকরা তাদের অসুস্থ সন্তানদের নিয়ে এক হাসপাতাল থেকে অন্য হাসপাতালে ছুটছেন।
দেশজুড়ে ছড়িয়ে পড়া এই প্রকোপের সবচেয়ে বড় শিকার হয়েছে ঢাকা বিভাগ। এই বিভাগে আক্রান্ত ও মৃত্যুর হার দেশের অন্য যেকোনো স্থানের চেয়ে অনেক বেশি। পরিসংখ্যানে দেখা যায়, গত তিন মাসে ঢাকা বিভাগেই হাম ও এর উপসর্গ নিয়ে ৩০৪ জন শিশুর মৃত্যু হয়েছে। আর এই সময়ে শুধু ঢাকাতেই আক্রান্ত হয়েছে ৪৯ হাজার ৭৮৩ জন।
চিকিৎসক ও বিশেষজ্ঞরা বলছেন, হাম একটি অত্যন্ত ছোঁয়াচে রোগ। বিশেষ করে যেসব শিশু পুষ্টিহীনতায় ভুগছে বা যাদের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা তুলনামূলক দুর্বল, তাদের ক্ষেত্রে এই রোগটি প্রাণঘাতী হয়ে উঠছে। গত কয়েকদিনের পরিসংখ্যান বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, প্রতিদিনই মৃত্যুর সংখ্যা জ্যামিতিক হারে বাড়ছে। এর আগে শুক্রবার ৪ জন এবং বৃহস্পতিবার ৫ জন শিশুর মৃত্যুর খবর জানিয়েছিল স্বাস্থ্য বিভাগ।
টিকা দেওয়ার পরও কেন এত শিশু আক্রান্ত হচ্ছে এবং মারা যাচ্ছে, তা নিয়ে জনমনে প্রশ্ন উঠেছে। জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, রোগের বিস্তার রোধে স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলার পাশাপাশি শিশুদের দ্রুত চিকিৎসকের শরণাপন্ন হওয়া অত্যন্ত জরুরি। কোনোভাবেই জ্বর বা গায়ে দাগ দেখামাত্র অবহেলা করা যাবে না। পরিস্থিতি দ্রুত নিয়ন্ত্রণে আনতে না পারলে এই মহামারি আরও ভয়াবহ রূপ নিতে পারে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন সংশ্লিষ্টরা।