দেশে হাম ও এর আনুষঙ্গিক উপসর্গে শিশুমৃত্যুর হার এখন অত্যন্ত উদ্বেগজনক পর্যায়ে গিয়ে ঠেকেছে। গত মাত্র এক মাসে এই ঘাতক ব্যাধি ও এর লক্ষণে প্রাণ হারিয়েছে ১৯৮টি শিশু, যা জনস্বাস্থ্য ব্যবস্থার ওপর এক বিশাল চাপ ও আতঙ্ক তৈরি করেছে।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সর্বশেষ বুলেটিন অনুযায়ী, গত বুধবার সকাল পর্যন্ত পূর্ববর্তী ২৪ ঘণ্টায় আরও তিন শিশুর মৃত্যু হয়েছে। এর মধ্যে একজনের মৃত্যু নিশ্চিতভাবে হামের কারণে হয়েছে এবং বাকি দুজন হামের উপসর্গে মারা গেছে। গত ১৫ মার্চ এ বছরে হামে প্রথম মৃত্যুর খবর পাওয়া যায়, আর মাত্র ৩০ দিনের ব্যবধানে এই সংখ্যা এখন দুইশর কাছাকাছি।
বর্তমানে হাসপাতালের চিত্রও বেশ ভয়াবহ। গত এক দিনে সারা দেশে ৬৬৬টি শিশু হামের উপসর্গ নিয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে এবং নতুন করে আরও ৭৬ জনের দেহে এই রোগটি শনাক্ত হয়েছে। সবচেয়ে আশঙ্কাজনক পরিস্থিতি বিরাজ করছে ঢাকা বিভাগে। ২৪ ঘণ্টায় দেশের বিভিন্ন হাসপাতালে ১ হাজার ৩২ জন শিশু হামের লক্ষণ নিয়ে এসেছে, যাদের অর্ধেকের বেশি অর্থাৎ ৫০৫ জনই ঢাকা বিভাগের বাসিন্দা। যদিও একই সময়ে ৪৬৮ জন সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরেছে, তবে নতুন রোগীর চাপে হিমশিম খাচ্ছে চিকিৎসাকেন্দ্রগুলো।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সামগ্রিক পরিসংখ্যান বলছে, ১৫ মার্চ থেকে এখন পর্যন্ত ৩২টি শিশু সরাসরি হামে এবং ১৬৬টি শিশু হামের উপসর্গে মারা গেছে। এই এক মাসে মোট ১৯ হাজার ১৬১ জন রোগী চিকিৎসার আওতায় এসেছে, যাদের মধ্যে ২ হাজার ৯৭৩ জনের দেহে রোগটি নিশ্চিতভাবে শনাক্ত হয়েছে।
পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ডা. মুশতাক হোসেন তিনটি জরুরি পদক্ষেপের কথা জানিয়েছেন। তিনি মনে করেন, টিকাদান কর্মসূচি (ভ্যাকসিন প্রয়োগ) জোরদার করার পাশাপাশি চিকিৎসাসেবা বিকেন্দ্রীকরণ (শহর থেকে গ্রামে ছড়িয়ে দেওয়া) এবং আক্রান্ত শিশুদের জন্য আলাদা বা পৃথক চিকিৎসার ব্যবস্থা করা এখন সময়ের দাবি। বর্তমানে ঢাকার ওপর রোগীর যে চাপ, তা কমাতে ঢাকার বাইরে দ্রুত বিশেষায়িত চিকিৎসাকেন্দ্র গড়ে তোলার পরামর্শ দিয়েছেন তিনি।
এদিকে ঢাকার বাইরে থেকেও শিশু মৃত্যুর খবর আসছে। চাঁপাইনবাবগঞ্জ প্রতিনিধি জানিয়েছেন, শিবগঞ্জ উপজেলার বিরাহিমপুর গ্রামের এক শিশু শ্বাসকষ্ট নিয়ে সদর হাসপাতালে ভর্তির মাত্র আধা ঘণ্টার মধ্যেই মারা গেছে। অন্যদিকে ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালেও সাত মাস বয়সী এক শিশুর মৃত্যু হয়েছে হামে আক্রান্ত হয়ে।
সংকটের এই মুহূর্তে আশার আলো দেখাচ্ছে রাজশাহীর টিকাদান কর্মসূচি। রাজশাহী সিটি করপোরেশন আগামী ২০ এপ্রিল থেকে ১০ মে পর্যন্ত বিশেষ হাম-রুবেলা টিকাদান অভিযান শুরু করতে যাচ্ছে। সিটি করপোরেশন প্রশাসক মাহফুজুর রহমান রিটন এক সংবাদ সম্মেলনে জানিয়েছেন, মহানগরের ৫৪ হাজার ১৪৪ শিশুকে এই টিকার আওতায় আনার লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে।
এক মাসে দুইশর কাছাকাছি শিশুর প্রাণহানি কোনোভাবেই হালকাভাবে দেখার সুযোগ নেই। আমাদের স্বাস্থ্য ব্যবস্থার সক্ষমতা এবং প্রাথমিক টিকাদান কর্মসূচির সীমাবদ্ধতাগুলো এই সংকটের মাধ্যমে আবারও সামনে এসেছে। অভিভাবক হিসেবে আমাদের যেমন সচেতন হতে হবে, তেমনি সরকারকে দ্রুত জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে বিশেষায়িত চিকিৎসা ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে। মনে রাখতে হবে, একটি শিশুর মৃত্যু মানে একটি সাজানো স্বপ্নের অকাল প্রয়াণ।