দেশজুড়ে আশঙ্কাজনক হারে বাড়ছে ছোঁয়াচে রোগ হামের প্রকোপ। গত ২৪ ঘণ্টায় হাম এবং এর উপসর্গ নিয়ে আরও আটটি শিশু প্রাণ হারিয়েছে। একই সময়ে নতুন করে আক্রান্ত হয়েছেন এক হাজার ১৮৫ জন। সোমবার স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের পক্ষ থেকে নিয়মিত প্রতিবেদনে এ তথ্য জানানো হয়েছে, যা দেশের সামগ্রিক স্বাস্থ্য পরিস্থিতি নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের নিয়মিত হাম বিষয়ক বিশেষ প্রতিবেদনে দেশের এই উদ্বেগজনক চিত্র ফুটে উঠেছে। সরকারি তথ্য অনুযায়ী, গত ১৫ মার্চ থেকে শুরু করে ৮ জুন পর্যন্ত দেশে হামের সংক্রমণ তীব্র আকার ধারণ করেছে। আক্রান্ত ও মৃত্যুর এই ক্রমবর্ধমান সংখ্যা দেশের সম্প্রসারিত টিকাদান কর্মসূচি এবং সাধারণ মানুষের স্বাস্থ্য সচেতনতাকে নতুন করে ভাবিয়ে তুলছে।
গত ২৪ ঘণ্টার পরিসংখ্যান বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, এই সময়ে নতুন করে সন্দেহজনক হামে আক্রান্ত হয়েছেন ১ হাজার ৯২ জন। এছাড়া পরীক্ষাগারে নিশ্চিত হওয়া নতুন রোগীর সংখ্যা ৯৩ জন। এই এক দিনে প্রাণ হারানো ৮ শিশুর মধ্যে ৭ জনই মারা গেছে সন্দেহজনক হামের উপসর্গ নিয়ে, আর ১ জন পরীক্ষাগারে (যেখানে বৈজ্ঞানিক পরীক্ষা-নিরীক্ষা ও রোগ নির্ণয় করা হয়) নিশ্চিত হওয়া হামের কারণে মারা গেছে। এই উপাত্ত ইঙ্গিত করে যে, গ্রামীণ ও প্রত্যন্ত অঞ্চলে অনেক শিশুই সঠিক রোগ নির্ণয় ও উপযুক্ত চিকিৎসা পাওয়ার আগেই মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়ছে।
চলতি বছরের ১৫ মার্চ থেকে ৮ জুন পর্যন্ত সময়ের সামগ্রিক সংক্রমণ পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ। এই নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে দেশে সন্দেহজনক হামরোগীর মোট সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৮০ হাজার ১০৪ জনে। এর মধ্যে চিকিৎসকদের নিবিড় পরীক্ষা-নিরীক্ষার পর নিশ্চিত হামরোগী হিসেবে শনাক্ত হয়েছেন ৯ হাজার ৭৭৯ জন। এই সময়ের মধ্যে সন্দেহজনক হামের লক্ষণ নিয়ে দেশের বিভিন্ন সরকারি ও বেসরকারি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় ভর্তি হতে হয়েছে ৬৫ হাজার ২৩৭ জন শিশুকে। চিকিৎসকদের আপ্রাণ চেষ্টায় ইতোমধ্যে সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরে গেছেন ৬১ হাজার ২৭৮ জন। তবে এখনও বহু শিশু বিভিন্ন চিকিৎসাকেন্দ্রে ভর্তি রয়েছে।
দীর্ঘমেয়াদী এই সংক্রমণ কেবল শিশুদের আক্রান্তই করছে না, কেড়ে নিচ্ছে বহু নিষ্পাপ প্রাণ। গত ১৫ মার্চ থেকে ৮ জুন পর্যন্ত সন্দেহজনক হাম এবং এর উপসর্গ নিয়ে মোট ৫৩৬ জন শিশুর মৃত্যুর খবর নথিবদ্ধ হয়েছে। পাশাপাশি পরীক্ষাগারে নিশ্চিত হওয়া হামের কারণে মারা গেছে আরও ৯২ জন শিশু। চিকিৎসকদের মতে, অপুষ্টি, যথাসময়ে প্রতিষেধক (রোগ প্রতিরোধ করার ঔষধ বা টিকা) না নেওয়া এবং পারিবারিক পর্যায়ে সচেতনতার অভাবই এই অকাল মৃত্যুর প্রধান কারণ।
চিকিৎসা বিশেষজ্ঞদের মতে, হাম একটি অত্যন্ত ছোঁয়াচে বায়ুবাহিত রোগ। সাধারণত তীব্র জ্বর, সর্দি, কাশি, চোখ লাল হওয়া এবং শরীরে লালচে দানাদার ফুসকুড়ি বা র্যাশ দেখা দেওয়া এর প্রধান লক্ষণ। সঠিক সময়ে শিশুকে হামের প্রতিষেধক টিকা না দিলে এই রোগ পরবর্তীতে নিউমোনিয়া (এক ধরনের মারাত্মক ফুসফুসের প্রদাহ) বা ক্ষতিকর মস্তিষ্কের প্রদাহের রূপ নিতে পারে, যা শেষ পর্যন্ত মৃত্যুর কারণ হয়ে দাঁড়ায়। সরকারি পর্যায়ে নিয়মিত টিকাদান কর্মসূচি চালু থাকলেও প্রত্যন্ত ও দুর্গম এলাকার অনেক শিশু এখনও এই প্রয়োজনীয় স্বাস্থ্যসেবার বাইরে রয়ে গেছে।
হামের মতো সম্পূর্ণ নিরাময়যোগ্য ও টিকা দিয়ে প্রতিরোধযোগ্য একটি রোগে এত বিপুল সংখ্যক শিশুর আক্রান্ত হওয়া এবং প্রাণ হারানো অত্যন্ত বেদনাদায়ক। বর্তমানের এই ঊর্ধ্বমুখী সংক্রমণ রোধে দেশব্যাপী বিশেষ করে বস্তি এলাকা, চরাঞ্চল ও অনগ্রসর অনগ্রসর এলাকায় জরুরি ভিত্তিতে বিশেষ টিকাদান অভিযান চালানো প্রয়োজন। একই সাথে অভিভাবকদের সচেতন করতে হবে যাতে শিশুর শরীরে সামান্যতম লক্ষণ দেখা মাত্রই বিলম্ব না করে নিকটস্থ স্বাস্থ্যকেন্দ্রে নিয়ে যাওয়া হয়। আমাদের সম্মিলিত সচেতনতা ও দ্রুত পদক্ষেপই পারে ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে এই মরণব্যাধি থেকে রক্ষা করতে।