দেশজুড়ে শিশুদের মাঝে অত্যন্ত ছোঁয়াচে রোগ হামের ভয়াবহ প্রকোপ দেখা দিয়েছে, যা রীতিমতো আতঙ্কের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। গত ২৪ ঘণ্টায় হাম ও এর উপসর্গ নিয়ে দেশের বিভিন্ন স্থানে আরও ১৬টি অবুঝ শিশুর করুণ মৃত্যু হয়েছে। গত মার্চ মাস থেকে শুরু হওয়া এই প্রাণঘাতী সংক্রমণে এখন পর্যন্ত পাঁচ শতাধিক শিশুর প্রাণহানি জনস্বাস্থ্য পরিস্থিতির এক চরম উদ্বেগজনক চিত্রই আমাদের সামনে তুলে ধরছে।
রোববার স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সংক্রামক রোগ সংক্রান্ত নিয়মিত সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে দেশের হাম পরিস্থিতির এই ভয়াবহ ও মর্মান্তিক চিত্র উঠে এসেছে। বিজ্ঞপ্তির তথ্য অনুযায়ী, গত এক দিনেই দেশজুড়ে নতুন করে ১২৮ জন শিশুর শরীরে আনুষ্ঠানিকভাবে হাম শনাক্ত হয়েছে। একই সময়ে হামের উপসর্গ নিয়ে প্রাণ হারিয়েছে ১৬ জন শিশু। চোখের সামনে আদরের সন্তানের এমন করুণ মৃত্যুতে হাসপাতালগুলোর প্রাঙ্গণে স্বজনদের ভারী আর্তনাদ ও শোকের ছায়া নেমে এসেছে।
সরকারি হিসাব অনুযায়ী, চলতি বছরের ১৫ মার্চ থেকে দেশে হামের এই অস্বাভাবিক প্রকোপ শুরু হয়। তখন থেকে এখন পর্যন্ত নিশ্চিতভাবে হামে আক্রান্ত হয়ে মারা গেছে ৮৬ জন শিশু। এর বাইরে, সন্দেহজনকভাবে হামের লক্ষণ বা উপসর্গ নিয়ে আরও ৪৪২ জন শিশুর মৃত্যু হয়েছে। সব মিলিয়ে গত কয়েক মাসে হাম ও এর উপসর্গে দেশে মোট ৫২২ জন শিশুর অকাল মৃত্যু হলো। চিকিৎসা বিশেষজ্ঞদের মতে, টিকাদান কর্মসূচির কোনো ঘাটতি বা পুষ্টিহীনতার কারণেই হয়তো এত বিপুল সংখ্যক শিশুর প্রাণহানি ঘটছে, যা একটি উন্নয়নশীল দেশের জন্য অত্যন্ত শঙ্কার বিষয়।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের দেওয়া এলাকাভিত্তিক পরিসংখ্যান বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, রাজধানী ঢাকা ও এর আশপাশের এলাকাগুলোতে এই রোগের প্রাদুর্ভাব ও মৃত্যুর হার সবচেয়ে বেশি। এখন পর্যন্ত সন্দেহজনক হামের লক্ষণ নিয়ে সবচেয়ে বেশি ১৭৪ জন শিশুর মৃত্যু হয়েছে ঢাকা বিভাগে। ঘনবসতিপূর্ণ এলাকা এবং বস্তিগুলোতে অস্বাস্থ্যকর পরিবেশের কারণে এই রোগ দ্রুত ছড়িয়ে পড়ছে বলে ধারণা করা হচ্ছে। ঢাকার পরেই সবচেয়ে বেশি প্রাণহানির ঘটনা ঘটেছে রাজশাহী বিভাগে, সেখানে এখন পর্যন্ত ৮০ জন শিশু মারা গেছে।
এদিকে, দেশের সরকারি ও বেসরকারি চিকিৎসাকেন্দ্রগুলোতে (হাসপাতাল) হামে আক্রান্ত শিশুদের উপচে পড়া ভিড় লক্ষ্য করা যাচ্ছে। শয্যা সংকটের কারণে অনেক চিকিৎসাকেন্দ্রের মেঝেতে বা বারান্দায় রেখে শিশুদের চিকিৎসা দিতে বাধ্য হচ্ছেন চিকিৎসক ও স্বাস্থ্যকর্মীরা। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্যমতে, গত ২৪ ঘণ্টায় হামের লক্ষণ নিয়ে ১ হাজার ৩০৬ জন রোগী চিকিৎসার জন্য চিকিৎসাকেন্দ্রে এসেছেন। তাদের শারীরিক অবস্থা আশঙ্কাজনক হওয়ায় ১ হাজার ১৬৯ জনকে তাৎক্ষণিকভাবে ভর্তি করে নেওয়া হয়েছে।
গত এক দিনে চিকিৎসাকেন্দ্রে ভর্তি হওয়া রোগীদের মধ্যে সবচেয়ে বেশি চাপ লক্ষ্য করা গেছে ঢাকার হাসপাতালগুলোতে। এখানে এক দিনেই ৪৪৭ জন নতুন রোগী ভর্তি হয়েছেন। অন্যদিকে, তুলনামূলকভাবে সবচেয়ে কম রোগী ভর্তি হয়েছেন রংপুর বিভাগে, সেখানে এই সংখ্যা মাত্র ১০ জন।
সারা দেশের সামগ্রিক চিত্র তুলে ধরে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর জানিয়েছে, দেশে এখন পর্যন্ত সন্দেহজনক হাম রোগীর মোট সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৬৩ হাজার ৮১৩ জনে। এর মধ্যে ডাক্তারি পরীক্ষার মাধ্যমে নিশ্চিতভাবে হাম শনাক্ত হয়েছে ৮ হাজার ৬২২ জনের শরীরে।
উল্লেখ্য, হাম (বায়ুবাহিত অত্যন্ত ছোঁয়াচে একটি রোগ, যা মূলত শ্বাসতন্ত্রকে আক্রমণ করে এবং শরীরে প্রচণ্ড জ্বর ও লালচে ফুসকুড়ি সৃষ্টি করে) শিশুদের জন্য মারাত্মক পরিণতি ডেকে আনতে পারে। হামের কারণে শিশুদের নিউমোনিয়া, মস্তিষ্কের প্রদাহ বা অন্ধত্বের মতো ভয়াবহ জটিলতা দেখা দিতে পারে। তবে নির্দিষ্ট বয়সে সরকারিভাবে দেওয়া হামের টিকা (রোগ প্রতিরোধক ব্যবস্থা) সঠিকভাবে গ্রহণ করলে এই রোগ সম্পূর্ণ প্রতিরোধ করা সম্ভব। এত বিপুল সংখ্যক শিশুর মৃত্যু প্রমাণ করে যে, দেশের কোনো কোনো প্রান্তে এখনো টিকাদান কর্মসূচির বাইরে রয়ে গেছে অনেক শিশু।
একবিংশ শতাব্দীতে এসে সম্পূর্ণ প্রতিরোধযোগ্য একটি রোগ 'হাম'-এর কারণে পাঁচ শতাধিক শিশুর মৃত্যু আমাদের স্বাস্থ্য ব্যবস্থার একটি বড় দুর্বলতাকেই আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেয়। বাংলাদেশ শিশু টিকাদান কর্মসূচিতে বিশ্বে একসময় রোল মডেল হিসেবে পরিচিত ছিল। তাহলে আজ কেন এই বিপুল সংখ্যক শিশু টিকার অভাবে বা অন্য কোনো কারণে হামের শিকার হয়ে মৃত্যুবরণ করছে? এই প্রশ্নের উত্তর খোঁজা এখন সময়ের সবচেয়ে বড় দাবি। সাধারণ মানুষের মাঝে সচেতনতা বৃদ্ধির পাশাপাশি, স্বাস্থ্য বিভাগকে অবিলম্বে দেশব্যাপী জরুরি টিকাদান ও অনুসন্ধান কর্মসূচি জোরদার করতে হবে। অবহেলা বা অসচেতনতার কারণে আর একটি শিশুরও যেন এমন অকাল মৃত্যু না হয়, তা রাষ্ট্র ও সমাজ—সবাইকে সম্মিলিতভাবে নিশ্চিত করতে হবে