দেশজুড়ে আশঙ্কাজনক হারে ছড়িয়ে পড়ছে সংক্রামক ব্যাধি হাম। গত ২৪ ঘণ্টায় সারা দেশে এই রোগে আক্রান্ত হয়ে একজনের নিশ্চিত মৃত্যু এবং হামের লক্ষণ নিয়ে আরও চারজনসহ মোট পাঁচজনের প্রাণহানি ঘটেছে। মাত্র দেড় মাসের ব্যবধানে আক্রান্তের সংখ্যা ২৮ হাজার ছাড়িয়ে যাওয়ায় সাধারণ মানুষের মধ্যে চরম আতঙ্ক ও উদ্বেগ বিরাজ করছে।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের নিয়ন্ত্রণ কক্ষ থেকে পাঠানো সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, গত ১৫ মার্চ থেকে ২৩ এপ্রিল পর্যন্ত দেশে সন্দেহভাজন হাম রোগীর সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ২৮ হাজার ৩৩৪ জনে। বৃহস্পতিবার প্রকাশিত সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়েছে, গত ২৪ ঘণ্টায় নতুন করে ১ হাজার ১৭০ জন সন্দেহভাজন রোগী শনাক্ত হয়েছে। এর মধ্যে ল্যাবরেটরি পরীক্ষায় ১২৫ জনের শরীরে হামের ভাইরাসের উপস্থিতি নিশ্চিত করা গেছে। সরকারি হিসাব মতে, গত দেড় মাসে নিশ্চিতভাবে হামে আক্রান্ত হয়ে ৩৯ জন প্রাণ হারিয়েছেন এবং হামের উপসর্গ নিয়ে মৃত্যু হয়েছে আরও ১৯৪ জনের।
হাসপাতালগুলোতে এখন তিল ধারণের ঠাঁই নেই। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের পরিসংখ্যান বলছে, গত দেড় মাসে ১৮ হাজার ৮৪৫ জন রোগী হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন। এর মধ্যে ১৫ হাজার ৭২৮ জন সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরলেও এখনো বিপুল সংখ্যক রোগী চিকিৎসাধীন রয়েছেন। বিশেষ করে শিশুদের মধ্যে এই রোগের প্রকোপ সবচেয়ে বেশি দেখা দিচ্ছে, যা জনস্বাস্থ্যের জন্য একটি বড় হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর ইতিমধেই সংশ্লিষ্ট সকল বিভাগকে জরুরি নির্দেশনা প্রদান করেছে।
চিকিৎসা বিশেষজ্ঞরা জানিয়েছেন, হাম একটি অত্যন্ত ছোঁয়াচে ভাইরাসজনিত রোগ যা বাতাসের মাধ্যমে দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে। হঠাৎ তীব্র জ্বর হওয়া, শরীরের চামড়ায় লালচে দানা বা ফুসকুড়ি (র্যাশ) ওঠা, চোখ লাল হয়ে যাওয়া এবং অনবরত কাশির মতো উপসর্গ দেখা দিলে বিষয়টিকে অবহেলা করা চলবে না। এমন লক্ষণ দেখা মাত্রই রোগীকে অন্যদের থেকে আলাদা রাখা এবং দ্রুত নিকটস্থ সরকারি স্বাস্থ্যকেন্দ্রে নিয়ে যাওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন চিকিৎসকরা। সেই সঙ্গে শিশুদের নিয়মিত টিকাদান বা প্রতিষেধক কর্মসূচি সময়মতো সম্পন্ন করার ওপর বিশেষ জোর দেওয়া হচ্ছে।
সারা দেশে হামের এই ঊর্ধ্বমুখী সংক্রমণ ঠেকাতে কেবল সরকারি প্রচেষ্টা যথেষ্ট নয়, প্রয়োজন তৃণমূল পর্যায়ে সচেতনতা। অনেক ক্ষেত্রেই অসচেতনতার কারণে অভিভাবকরা শিশুদের টিকাদান কেন্দ্র থেকে দূরে রাখেন, যা বর্তমানে এই মহামারি সদৃশ পরিস্থিতির অন্যতম কারণ হতে পারে। স্বাস্থ্য বিভাগকে দ্রুত আক্রান্ত এলাকাগুলোতে বিশেষ টিকাদান কর্মসূচি (ক্যাম্পেইন) পরিচালনার পাশাপাশি জনসচেতনতা বৃদ্ধিতে আরও সক্রিয় ভূমিকা পালন করতে হবে।
হামের মতো প্রতিরোধযোগ্য একটি রোগের এমন ব্যাপক বিস্তার আমাদের জনস্বাস্থ্য ব্যবস্থার সক্ষমতাকে প্রশ্নের মুখে ফেলেছে। যখন আক্রান্তের সংখ্যা কয়েক হাজারে পৌঁছায়, তখন বুঝতে হবে টিকাদান কর্মসূচিতে কোথাও বড় ধরনের ফাঁক রয়ে গেছে। সময় থাকতে সমন্বিত পদক্ষেপ না নিলে এই সংক্রামক ব্যাধি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যেতে পারে।