দেশে মহামারি আকারে ছড়িয়ে পড়া হামের প্রকোপ দিন দিন আরও উদ্বেগজনক হয়ে উঠছে। গত ২৪ ঘণ্টায় হামে আক্রান্ত হয়ে এবং এর তীব্র উপসর্গ নিয়ে দেশের বিভিন্ন স্থানে আরও ৫ শিশুর মৃত্যু হয়েছে। একই সময়ে নতুন করে আরও ১ হাজার ১১৯ জনের শরীরে হাম ও এর লক্ষণ শনাক্ত হয়েছে।
বৃহস্পতিবার (২ জুলাই) স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের নিয়মিত স্বাস্থ্য বুলেটিন ও সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে এই তথ্য নিশ্চিত করা হয়েছে। বিজ্ঞপ্তির তথ্য অনুযায়ী, গত ১৫ মার্চ থেকে শুরু করে আজ ২ জুলাই পর্যন্ত সারা দেশে হাম এবং এর তীব্র উপসর্গ নিয়ে মোট ৭২৪ জন শিশুর প্রাণহানি ঘটেছে। মৃত শিশুদের মধ্যে ৯৩ জন নিশ্চিতভাবে হামে আক্রান্ত ছিল বলে গবেষণাগারের পরীক্ষায় প্রমাণিত হয়েছে। অন্যদিকে, বাকি ৬৩১ জন শিশু হামের তীব্র ও জটিল উপসর্গ নিয়ে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা গেছে।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তর জানিয়েছে, গত ২৪ ঘণ্টায় নতুন করে আরও ১৫৪ জন শিশুর শরীরে নিশ্চিতভাবে হামের জীবাণু শনাক্ত করা হয়েছে। একই সময়ে হামের উপসর্গ দেখা দিয়েছে আরও ৯৬৫ জন শিশুর। আক্রান্তদের শারীরিক অবস্থা বিবেচনায় নিয়ে গত এক দিনে দেশের বিভিন্ন বিশেষায়িত ও সাধারণ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে ৯০২ জন শিশুকে। তবে আশার কথা হলো, যথাযথ চিকিৎসা শেষে সুস্থ হয়ে গত ২৪ ঘণ্টায় হাসপাতাল থেকে ছাড়পত্র পেয়ে বাড়ি ফিরে গেছে ৮৭৭ জন শিশু।
জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, হাম একটি অত্যন্ত ছোঁয়াচে এবং প্রাণঘাতী ভাইরাসজনিত রোগ, যা সাধারণত অসচেতনতা ও সময়মতো টিকা না নেওয়ার কারণে দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে। আক্রান্ত শিশুর সংস্পর্শে এলে অন্য শিশুদেরও এটি দ্রুত সংক্রমিত করতে পারে। সাধারণত তীব্র জ্বর, শরীরে লালচে দানা বা ফুসকুড়ি ওঠা, সর্দি-কাশি এবং চোখ লাল হওয়া এই রোগের প্রধান লক্ষণ। সঠিক সময়ে চিকিৎসা না করালে হামের জটিলতা থেকে নিউমোনিয়া (ফুসফুসের প্রদাহ), ডায়রিয়া এবং মস্তিষ্কের প্রদাহের মতো মারাত্মক সমস্যা তৈরি হতে পারে, যা শিশুর মৃত্যুর কারণ হয়ে দাঁড়ায়।
বিশেষ করে গ্রামীণ এলাকা ও শহরের সুবিধাবঞ্চিত বস্তিগুলোতে হামের টিকা নেওয়ার হার কম হওয়ায় সেসব অঞ্চলে আক্রান্তের সংখ্যা বেশি। অনেক অভিভাবকই শিশুর জ্বর বা ফুসকুড়িকে সাধারণ ঠান্ডা-কাশি মনে করে অবহেলা করেন, যা পরিস্থিতিকে আরও ঝুঁকিপূর্ণ করে তোলে। চিকিৎসকদের মতে, শিশুর শরীরে হামের লক্ষণ দেখা মাত্রই চিকিৎসকের শরণাপন্ন হওয়া উচিত এবং কোনো অবস্থাতেই কবিরাজি বা অপচিকিৎসার আশ্রয় নেওয়া যাবে না।
এই পরিস্থিতিতে আক্রান্ত শিশুদের পুষ্টিকর খাবার এবং পর্যাপ্ত তরল জাতীয় খাদ্য খাওয়ানোর পরামর্শ দিচ্ছেন চিকিৎসকেরা। একই সাথে সংক্রমিত শিশুকে পরিবারের অন্য সুস্থ শিশুদের থেকে আলাদা রাখার তাগিদ দেওয়া হয়েছে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, দেশের যেসকল এলাকায় হামের প্রকোপ বেশি দেখা যাচ্ছে, সেখানে বিশেষ টিকাদান কর্মসূচি জোরদার করা হচ্ছে। ৯ মাস এবং ১৫ মাস বয়সী সকল শিশুকে হাম ও রুবেলার প্রতিষেধক টিকা নিশ্চিত করার জন্য অভিভাবকদের প্রতি বিশেষভাবে অনুরোধ জানানো হয়েছে। সরকার ও স্বাস্থ্য বিভাগের সমন্বিত প্রচেষ্টার পাশাপাশি সামাজিক সচেতনতা বৃদ্ধি না পেলে এই সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন হবে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকেরা।