উত্তর আমেরিকায় আগামী ফুটবল বিশ্বকাপের দামামা বাজতে আর মাত্র দুই মাস বাকি। ঠিক এই মুহূর্তে ব্রাজিলের প্রাণভ্রমরা নেইমার জুনিয়রকে দলে রাখা নিয়ে শুরু হয়েছে এক নতুন নাটকীয়তা, যেখানে খোদ দেশের রাষ্ট্রপ্রধানের পরামর্শ চেয়েছেন কোচ কার্লো আনচেলত্তি।
নেইমার জুনিয়র ব্রাজিলের জার্সিতে আরও একটি বিশ্বকাপ রাঙাতে চান, কিন্তু পাঁচবারের বিশ্বচ্যাম্পিয়নদের দলে তার ফেরার পথটি মোটেও মসৃণ নয়। সেলেসাওদের (ব্রাজিল জাতীয় ফুটবল দলের ডাকনাম) অভিজ্ঞ ইতালিয়ান কোচ কার্লো আনচেলত্তি শুরু থেকেই কঠোর অবস্থানে রয়েছেন। তিনি সাফ জানিয়ে দিয়েছেন, কেবল নামের জোরে নয়, বরং শতভাগ শারীরিক সক্ষমতা বা ফিটনেস প্রমাণ করেই নেইমারকে দলে জায়গা করে নিতে হবে। সমর্থকদের প্রবল আবেগ আর সাবেক ফুটবলারদের অনুরোধ সত্ত্বেও আনচেলত্তি নিজের সিদ্ধান্তে অনড় ছিলেন।
তবে সম্প্রতি এক চাঞ্চল্যকর তথ্য সামনে এসেছে। নেইমারকে বিশ্বকাপ স্কোয়াডে রাখা সমীচীন হবে কি না, তা নিয়ে ব্রাজিলের প্রেসিডেন্ট লুইজ ইনাসিও লুলা দা সিলভার সাথে রুদ্ধদ্বার বৈঠক করেছেন আনচেলত্তি। ব্রাজিলভিত্তিক একটি সংবাদমাধ্যমকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে প্রেসিডেন্ট লুলা নিজেই এই আলোচনার সত্যতা নিশ্চিত করেছেন। তিনি জানান, ২৬ জানুয়ারি ২০২৭ সালের নারী বিশ্বকাপ সংক্রান্ত এক অনুষ্ঠানে তাদের দেখা হলে আনচেলত্তি সরাসরি তার মতামত জানতে চান।
প্রেসিডেন্ট লুলা এ প্রসঙ্গে বলেন, "আনচেলত্তি আমাকে জিজ্ঞেস করেছিলেন, আমার মতে নেইমারকে ডাকা উচিত কি না। আমি তাকে বলেছি, নেইমারের ফুটবল প্রতিভা নিয়ে কোনো সন্দেহ নেই। কিন্তু মূল প্রশ্ন হলো তার শারীরিক অবস্থা। যদি সে পুরোপুরি সুস্থ থাকে, তবে তার মতো প্রতিভাকে উপেক্ষা করা কঠিন।" উল্লেখ্য যে, বর্তমানে সান্তোসের হয়ে নেইমার গোল ও সহায়তায় (অ্যাসিস্ট) নিয়মিত অবদান রাখলেও ৩৪ বছর বয়সী এই তারকার টানা দীর্ঘ টুর্নামেন্ট খেলার সক্ষমতা নিয়ে ফুটবল বিশ্লেষকদের মধ্যে সংশয় রয়েছে।
আলোচনাকালে প্রেসিডেন্ট লুলা নেইমারকে বর্তমান বিশ্বের দুই মহাতারকা লিওনেল মেসি ও ক্রিস্টিয়ানো রোনালদোর উদাহরণ টেনে পরামর্শ দিয়েছেন। তার মতে, নেইমারকে যদি জাতীয় দলে স্থায়ী হতে হয়, তবে তাকে আরও বেশি পেশাদার হতে হবে। শুধু তারকাখ্যাতি দিয়ে নয়, বরং দক্ষতা ও নিবেদন দিয়ে দলে জায়গা অর্জন করতে হবে। লুলা রসিকতা করে আনচেলত্তিকে তার প্রিয় ক্লাব করিন্থিয়ান্সের দায়িত্ব নেওয়ার অনুরোধও জানিয়েছিলেন সেই বৈঠকে।
বর্তমানে নেইমার এবং গোটা ব্রাজিল চাতক পাখির মতো চেয়ে আছে আনচেলত্তির চূড়ান্ত দল ঘোষণার দিকে। ফিফা প্রেসিডেন্ট জিয়ান্নি ইনফান্তিনো এবং ব্রাজিল ফুটবল ফেডারেশনের সভাপতি সামির জাউদের উপস্থিতিতে হওয়া সেই আলোচনা এখন বিশ্ব ফুটবলের টক অব দ্য টাউন (আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু)। নেইমার কি পারবেন মেসি-রোনালদোর মতো শৃঙ্খলা মেনে শেষ মুহূর্তে বিশ্বকাপের টিকিট কাটতে, নাকি মাঠের বাইরেই কাটাতে হবে এই মহা আসর—তা এখন সময়ের অপেক্ষা।
একজন কোচের খেলোয়াড় নির্বাচন প্রক্রিয়ায় রাষ্ট্রপ্রধানের পরামর্শ নেওয়াটা ফুটবল ইতিহাসে বিরল। এটি যেমন নেইমারের গুরুত্বকে ফুটিয়ে তোলে, তেমনি কোচ আনচেলত্তির ওপর থাকা মানসিক চাপের বহিঃপ্রকাশও বটে। শেষ পর্যন্ত আবেগ নাকি পেশাদারিত্ব—কোনটি জয়ী হয়, তার ওপর নির্ভর করছে ব্রাজিলের ষষ্ঠ বিশ্বকাপ জয়ের স্বপ্ন। নেইমার যদি নিজেকে পুনর্গঠন করতে পারেন, তবে সেটি হবে ফুটবলের এক রূপকথার প্রত্যাবর্তন।