মানিকগঞ্জ সদরের কান্দারপাড়া গ্রামে এক শিশুর মর্মান্তিক হত্যাকাণ্ডকে কেন্দ্র করে সৃষ্ট গণপিটুনিতে দুই ব্যক্তির মৃত্যুর ঘটনায় পুরো এলাকায় থমথমে পরিস্থিতি বিরাজ করছে। পুলিশের গ্রেফতার এড়াতে গ্রামের প্রায় সব পুরুষ ঘরবাড়ি ছেড়ে আত্মগোপনে চলে যাওয়ায় গ্রামটি এখন প্রায় পুরুষশূন্য।
মানিকগঞ্জ সদর উপজেলার বনপারিলের কান্দারপাড়া গ্রামে গত ১৬ এপ্রিল এক হৃদয়বিদারক ঘটনার সূত্রপাত হয়। ওইদিন বিকেলে সৌদিপ্রবাসী দুদল মিয়ার সাত বছর বয়সী কন্যাসন্তান আতিকা আক্তার নিখোঁজ হয়। অনেক খোঁজাখুঁজির পর প্রতিবেশী কিশোর নাঈমকে স্থানীয়রা আটকে জিজ্ঞাসাবাদ করলে বেরিয়ে আসে চাঞ্চল্যকর তথ্য। নাঈম স্বীকার করে যে, শিশু আতিকার কানের সোনার অলংকারের লোভে সে তাকে হাত-পা বেঁধে একটি ভুট্টাক্ষেতে ফেলে রেখে অলংকারগুলো বাজারে বিক্রি করে দিয়েছে। ওই রাতেই নাঈমের দেখানো স্থান থেকে আতিকার নিথর দেহ উদ্ধার করা হয়।
নিষ্পাপ শিশুটির মৃত্যুর খবর ছড়িয়ে পড়লে গ্রামবাসীর মধ্যে তীব্র ক্ষোভের সৃষ্টি হয়। উত্তেজিত জনতা তাৎক্ষণিকভাবে অভিযুক্ত নাঈমের বাবা পান্নু মিয়া ও চাচা ফজলুর রহমানকে ধরে এনে বেদম প্রহার শুরু করে। গণপিটুনিতে ঘটনাস্থলেই ওই দুই ব্যক্তির মৃত্যু হয়। এমনকি উত্তেজিত জনতা তাদের মরদেহ গুম করার উদ্দেশ্যে পাশের একটি ডোবায় ফেলে দেয়। এই ঘটনায় নাঈমের বড় ভাই নাজমুল হোসেনও গুরুতর আহত হন।
এই জোড়া খুনের ঘটনায় এলাকায় আইনি জটিলতা ও অস্থিরতা চরমে পৌঁছেছে। নিহত শিশুর মা আরিফা আক্তার গত ১৮ এপ্রিল পাঁচজনের নাম উল্লেখ করে একটি মামলা করেন। অন্যদিকে, গণপিটুনিতে নিহত পান্নু মিয়ার স্ত্রী নার্গিস ১৯ এপ্রিল পাল্টা একটি হত্যা মামলা দায়ের করেন। এই মামলায় ৭ জনের নাম উল্লেখ থাকলেও আরও ৮০ থেকে ৯০ জনকে ‘অজ্ঞাতনামা’ (যাদের পরিচয় নিশ্চিত নয় এমন ব্যক্তি) আসামি করা হয়েছে। এই বিপুল সংখ্যক অজ্ঞাতনামা আসামির তালিকার কারণেই মূলত পুরো গ্রামে গ্রেফতার আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে।
বর্তমানে কান্দারপাড়া গ্রামের চিত্র অত্যন্ত করুণ। বাড়িতে কোনো পুরুষ সদস্য না থাকায় নারীরা চরম নিরাপত্তাহীনতা ও আতঙ্কে দিন কাটাচ্ছেন। স্থানীয় এক নারী গণমাধ্যমকর্মীদের জানান, অজ্ঞাতনামা মামলার ভয়ে সাধারণ মানুষও বাড়ি ফিরতে পারছে না। সবুরা নামে অন্য এক নারী বলেন, গ্রামে ভয়ের পরিবেশ দিন দিন বাড়ছে। এদিকে নিহত আতিকার মা নাঈমের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি চাইলেও বর্তমানে তিনিও নিজের নিরাপত্তা নিয়ে শঙ্কিত।
পুলিশ জানিয়েছে, অভিযুক্ত কিশোর নাঈমকে গত ১৮ এপ্রিল ঢাকার নবাবগঞ্জ থেকে আটক করা হয়েছে। তার কাছে কোনো দূরভাষ (মোবাইল ফোন) না থাকায় সনাতন পদ্ধতিতে গোয়েন্দা নজরদারির মাধ্যমে তাকে গ্রেফতার করা হয়। নাঈমের দেওয়া তথ্যমতে লুণ্ঠিত স্বর্ণালংকারও উদ্ধার করেছে পুলিশ।
মানিকগঞ্জের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার মো. সালাউদ্দিন বলেন, একটি অপরাধের বিচার করতে গিয়ে আইন নিজের হাতে তুলে নিয়ে অন্য অপরাধে জড়িয়ে পড়া অত্যন্ত দুঃখজনক। কাউকে আইন হাতে তুলে না নেওয়ার আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, পুলিশ উভয় পক্ষের মামলাগুলো অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে খতিয়ে দেখছে।
একটি অপরাধের প্রতিশোধ নিতে গিয়ে যখন সাধারণ মানুষ আইন নিজের হাতে তুলে নেয়, তখন পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে ওঠে। শিশু আতিকার মৃত্যু যেমন বেদনাদায়ক, তেমনি গণপিটুনিতে দুই ব্যক্তির মৃত্যুও আইনের দৃষ্টিতে বড় অপরাধ। এই ঘটনার ফলে একটি সাজানো-গোছানো গ্রাম আজ পুরুষশূন্য এবং আতঙ্কিত। অপরাধীর বিচার নিশ্চিত করার দায়িত্ব রাষ্ট্রের; সাধারণ মানুষের আবেগপ্রসূত পদক্ষেপ যেন নিরপরাধ কাউকে বিপদে না ফেলে, সেদিকে সকলের সজাগ দৃষ্টি রাখা প্রয়োজন।