সিলেট বিভাগে হাম ও হামের উপসর্গ নিয়ে মৃত্যুর সংখ্যা আশঙ্কাজনকভাবে বাড়ছে। গত ২৪ ঘণ্টায় বিভাগের দুটি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় আরও চার শিশুর মৃত্যু হয়েছে। এ নিয়ে চলতি বছর সিলেট বিভাগে হামের উপসর্গ নিয়ে মোট ৫১ জন শিশুর মৃত্যু হলো।
সিলেট প্রতিনিধি: সিলেট অঞ্চলে শিশুদের মধ্যে হামের প্রকোপ উদ্বেগজনক রূপ নিয়েছে। গত শুক্রবার সকাল ৮টা থেকে শনিবার সকাল ৮টা পর্যন্ত ২৪ ঘণ্টায় সিলেটের দুটি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় আরও চার শিশুর মৃত্যু হয়েছে। সিলেট বিভাগীয় স্বাস্থ্য দপ্তরের সহকারী পরিচালক মোহাম্মদ নূরে আলম শামীম এ তথ্য নিশ্চিত করেছেন। সরকারি তথ্য অনুযায়ী, এ নিয়ে চলতি বছর সিলেট বিভাগে হামের উপসর্গ নিয়ে মৃত শিশুর সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৫১ জনে, আর সারাদেশে এই সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৫০৩ জনে।
সিলেট স্বাস্থ্য বিভাগের প্রতিবেদন অনুযায়ী, গত ২৪ ঘণ্টায় মারা যাওয়া শিশুদের মধ্যে দুজন সিলেট শহীদ শামসুদ্দিন আহমদ হাসপাতালে এবং দুজন সিলেট এম এ জি ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন ছিল। শামসুদ্দিন হাসপাতালে মারা যাওয়া শিশুদের মধ্যে এক বছর তিন মাস বয়সী আরাবি আহমদ সিলেট মহানগরের শাহপরাণ এলাকার রফিকুল ইসলামের ছেলে। অন্যজন সিলেট জেলার ফেঞ্চুগঞ্জ উপজেলার সাবলু মিয়ার দশ মাস বয়সী ছেলে আবিদ।
অন্যদিকে, ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে মারা যাওয়া দুই শিশুর মধ্যে একজন সুনামগঞ্জের দিরাই উপজেলার নিপেশ রায়ের ছয় মাস বয়সী ছেলে নিলয় রায়। অপরজন মৌলভীবাজারের শ্রীমঙ্গল উপজেলার ফারুক মিয়ার পাঁচ মাস বয়সী ছেলে নাফি ইসলাম। মারা যাওয়া শিশুদের বয়স বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, সবাই অত্যন্ত কম বয়সী এবং প্রত্যেকেই হামের তীব্র উপসর্গ নিয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছিল।
সিলেট বিভাগীয় স্বাস্থ্য পরিচালকের কার্যালয় সূত্রে জানা গেছে, গত শুক্রবার সকাল ৮টা থেকে শনিবার সকাল ৮টা পর্যন্ত বিভাগের বিভিন্ন সরকারি হাসপাতালে হামের উপসর্গ নিয়ে নতুন করে আরও ৪৩ জন রোগী ভর্তি হয়েছে। চলতি বছরের ১ জানুয়ারি থেকে এ পর্যন্ত বিভাগে ল্যাবরেটরিতে নিশ্চিত হওয়া হাম রোগীর সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ১৫৮ জনে। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি আক্রান্ত শনাক্ত হয়েছে সুনামগঞ্জে ৮৪ জন। এ ছাড়া সিলেটে ৪২ জন, মৌলভীবাজারে ১৬ জন এবং হবিগঞ্জে ১৬ জন (যার মধ্যে ২ জন রুবেলা ভাইরাসে আক্রান্ত) শনাক্ত হয়েছেন।
বর্তমানে সিলেটের বিভিন্ন সরকারি হাসপাতাল ও উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সগুলোতে হামের উপসর্গ নিয়ে মোট ২৯৫ জন রোগী চিকিৎসাধীন রয়েছেন। এর মধ্যে সিলেট শহীদ শামসুদ্দিন আহমদ হাসপাতালে ৮৯ জন, ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ৫৮ জন এবং সুনামগঞ্জ জেলা সদর হাসপাতালে ৫৫ জন ভর্তি রয়েছেন। বাকি রোগীরা বিভাগের অন্যান্য সরকারি ও বেসরকারি স্বাস্থ্যকেন্দ্রে চিকিৎসা নিচ্ছেন।
স্বাস্থ্য বিভাগের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, চলতি বছরে সিলেট বিভাগে সন্দেহজনক হামের উপসর্গ নিয়ে ৪৭ জনের মৃত্যু হয়েছে এবং ল্যাবরেটরিতে হাম নিশ্চিত হওয়া রোগীর মধ্যে ৪ জনের মৃত্যু হয়েছে। অর্থাৎ মোট মৃত্যুর সংখ্যা ৫১। অন্যদিকে, স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সর্বশেষ জাতীয় বুলেটিন অনুযায়ী, সারাদেশে গত ১৫ মার্চ থেকে এ পর্যন্ত ল্যাব নিশ্চিত হওয়া ৮৫ জন এবং হামের উপসর্গ নিয়ে ৪১৪ জনসহ মোট ৫০৩ জনের মৃত্যু হয়েছে।
শিশুদের সংক্রামক ব্যাধি হাম প্রতিরোধে সরকারের টিকাদান কর্মসূচি অত্যন্ত কার্যকর হলেও সাম্প্রতিক এই মৃত্যুর মিছিল গ্রামীণ ও প্রত্যন্ত অঞ্চলে সচেতনতার অভাবকে নির্দেশ করে। বিশেষ করে সুনামগঞ্জের হাওর অঞ্চল কিংবা মৌলভীবাজারের চা বাগান এলাকার মতো সুবিধাবঞ্চিত ও দুর্গম অঞ্চলের শিশুরা সময়মতো টিকা পাচ্ছে কি না, তা খতিয়ে দেখা জরুরি। হামের মতো প্রতিরোধযোগ্য রোগে এত শিশুর প্রাণহানি রোধ করতে টিকাদান কর্মসূচির আওতা আরও বাড়ানো এবং যেকোনো উপসর্গ দেখামাত্রই শিশুদের নিকটস্থ হাসপাতালে নেওয়ার জন্য অভিভাবকদের উদ্বুদ্ধ করতে হবে।