দেশে মহামারি আকারে ছড়িয়ে পড়া হামের প্রকোপে গত এক দিনে উপসর্গ নিয়ে আরও তিন শিশুর মর্মান্তিক মৃত্যু হয়েছে। একই সময়ে নতুন করে আক্রান্ত হয়েছেন আরও ১১৭ জন, যা দেশের জনস্বাস্থ্য পরিস্থিতিকে মারাত্মক ঝুঁকির মুখে ঠেলে দিয়েছে এবং চিকিৎসালয়গুলোতে রোগীর চাপ বহুগুণ বাড়িয়ে দিয়েছে।
শনিবার সরকারের স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের হাম সংক্রান্ত নিয়মিত তথ্যপত্রে এই উদ্বেগজনক চিত্র তুলে ধরা হয়েছে। সরকারি হিসাব অনুযায়ী, গত ১৫ মার্চ থেকে শুরু করে শনিবার সকাল আটটা পর্যন্ত সারা দেশে হামে আক্রান্ত হয়ে নিশ্চিতভাবে মৃতের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৯১ জনে। তবে পরীক্ষা-নিরীক্ষা ছাড়া কেবল হামের উপসর্গ নিয়ে মারা যাওয়া শিশুদের সংখ্যা হিসাব করলে এই প্রাণহানির চিত্র আরও ভয়াবহ হয়ে ওঠে। তথ্যপত্র অনুযায়ী, এখন পর্যন্ত উপসর্গ নিয়ে মৃতের মোট সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৫২২ জনে, যার সিংহভাগই কোমলমতি শিশু।
ভৌগোলিক অবস্থান বিবেচনায় দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের মধ্যে রাজধানী ঢাকা ও এর আশপাশের এলাকায় এই রোগের প্রকোপ সবচেয়ে বেশি দেখা গেছে। এখন পর্যন্ত হামের লক্ষণ নিয়ে সবচেয়ে বেশি প্রাণহানি ঘটেছে ঢাকা বিভাগে, যেখানে মৃতের সংখ্যা ২১৬ জন। এর পরেই রয়েছে রাজশাহী বিভাগ, যেখানে প্রাণ গেছে ৮৫ জনের। এছাড়া উত্তর-পূর্বাঞ্চলের সিলেট বিভাগেও মৃত্যুর হার আশঙ্কাজনকভাবে বাড়ছে; সেখানে এখন পর্যন্ত মৃতের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৬৩ জনে। দেশের প্রধান প্রধান বিভাগীয় শহরগুলোতে এভাবে মৃত্যুর সংখ্যা বাড়তে থাকায় অভিভাবক ও স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মধ্যে গভীর উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, সবশেষ ২৪ ঘণ্টায় সারা দেশে নতুন করে ৯১৫ জন হামের নানা লক্ষণ ও উপসর্গ নিয়ে বিভিন্ন চিকিৎসালয় বা স্বাস্থ্যকেন্দ্রে চিকিৎসা নিতে এসেছেন। তাদের মধ্যে তীব্র উপসর্গ থাকায় ৮৪৭ জনকে বিভিন্ন সরকারি ও বেসরকারি চিকিৎসালয়ে ভর্তি করা হয়েছে। সবশেষ ২৪ ঘণ্টায় চিকিৎসালয়ে ভর্তি হওয়া রোগীদের বড় অংশই ঢাকার বাসিন্দা। ঢাকার বিভিন্ন চিকিৎসালয়ে গত এক দিনে ভর্তি হয়েছেন ৩৫৫ জন রোগী। অন্যদিকে দেশের উত্তরের জেলা রংপুরে এই প্রকোপ তুলনামূলক কম, সেখানে নতুন করে মাত্র ১০ জন চিকিৎসালয়ে ভর্তি হয়েছেন। সব মিলিয়ে বর্তমানে দেশে হামের উপসর্গ থাকা মোট রোগীর সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৭৭ হাজার ৭৯১ জনে। সংগৃহীত বিভিন্ন নমুনা পরীক্ষা করে এখন পর্যন্ত ৯ হাজার ৬২০ জনের দেহে নিশ্চিতভাবে হামের অতি ক্ষুদ্র রোগজীবাণুর (ভাইরাস) উপস্থিতি বা রোগ শনাক্ত করা সম্ভব হয়েছে।
চিকিৎসা বিশেষজ্ঞদের মতে, হাম একটি অত্যন্ত ছোঁয়াচে এবং তীব্র বায়ুবাহিত রোগ, যা প্রধানত অসচেতনতা এবং সঠিক সময়ে প্রতিষেধক টিকা না নেওয়ার কারণে ছড়ায়। আক্রান্ত ব্যক্তির হাঁচি-কাশির মাধ্যমে এই রোগ দ্রুত এক শিশু থেকে অন্য শিশুর শরীরে ছড়িয়ে পড়ে। বিশেষ করে পুষ্টিহীনতায় ভোগা শিশুদের ক্ষেত্রে এই রোগ প্রাণঘাতী রূপ ধারণ করতে পারে। হামের প্রাথমিক লক্ষণগুলোর মধ্যে রয়েছে তীব্র জ্বর, সর্দি-কাশি, চোখ লাল হয়ে যাওয়া এবং সারা শরীরে লালচে দানা বা ফুসকুড়ি ওঠা। অনেক সময় হামের জটিলতা হিসেবে ফুসফুসের তীব্র প্রদাহ (নিউমোনিয়া), কান পাকা বা তীব্র পাতলা পায়খানা দেখা দেয়, যা সঠিক সময়ে চিকিৎসা না পেলে শিশুর মৃত্যুর কারণ হতে পারে।
এই মহামারি পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে স্বাস্থ্য বিভাগকে আরও দ্রুত ও সমন্বিত পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে বলে মনে করছেন নীতিনির্ধারকরা। দেশের প্রতিটি গ্রামীণ ও নগর স্বাস্থ্যকেন্দ্রে প্রতিষেধক টিকার পর্যাপ্ত সরবরাহ নিশ্চিত করা জরুরি। একই সাথে যে সমস্ত শিশু এখনও নিয়মিত টিকাদান কর্মসূচির আওতায় আসেনি, তাদের খুঁজে বের করে দ্রুত টিকার আওতায় আনতে হবে। প্রত্যন্ত অঞ্চলের মা ও অভিভাবকদের সচেতন করতে বিশেষ উঠান বৈঠক ও প্রচারণা জোরদার করা আবশ্যক।
দেশে হামের মতো একটি সম্পূর্ণ প্রতিরোধযোগ্য রোগে এত বিপুল সংখ্যক শিশুর মৃত্যু অত্যন্ত দুঃখজনক এবং এটি আমাদের জনস্বাস্থ্য ব্যবস্থার সামগ্রিক দুর্বলতাকে নির্দেশ করে। টিকাদান কর্মসূচিতে বাংলাদেশ অতীতে বৈশ্বিক প্রশংসা পেলেও বর্তমান সংক্রমণ ও মৃত্যুর হার প্রমাণ করে যে মাঠপর্যায়ে এখনও বড় ধরনের সচেতনতার ঘাটতি রয়ে গেছে। শিশুদের সুরক্ষায় কেবল চিকিৎসালয়ে শয্যা সংখ্যা বাড়ানোই সমাধান নয়, বরং প্রতিটি শিশুকে প্রতিষেধক টিকার আওতায় আনা এবং অভিভাবকদের মধ্যে সচেতনতা তৈরি করাই প্রধান পথ। এই নীরব ঘাতক থেকে দেশের ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে বাঁচাতে রাষ্ট্র ও সমাজকে এখনই সম্মিলিতভাবে প্রতিরোধ গড়ে তুলতে হবে।