দেশে হাম ও হামের মতো উপসর্গ নিয়ে শিশুমৃত্যুর মিছিল যেন থামছেই না। গত ২৪ ঘণ্টায় আরও তিন শিশুর মৃত্যুর মধ্য দিয়ে দেশে এই প্রাণঘাতী রোগ ও এর উপসর্গে প্রাণহানির সংখ্যা ৬৩১ জনে গিয়ে ঠেকেছে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সবশেষ তথ্যে দেখা যাচ্ছে, প্রতিদিনই শত শত শিশু জ্বর ও ফুসকুড়ির মতো হামের লক্ষণ নিয়ে হাসপাতালে ভিড় করছে, যা জনস্বাস্থ্যের জন্য এক বড় ধরনের সতর্কবার্তা হয়ে দাঁড়িয়েছে।
মঙ্গলবার সকালে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের (দেশের জনস্বাস্থ্য ও চিকিৎসা ব্যবস্থা পরিচালনার প্রধান সরকারি দপ্তর) দেওয়া নিয়মিত সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে দেশের হাম পরিস্থিতির এক চরম উদ্বেগজনক চিত্র উঠে এসেছে। বিজ্ঞপ্তির তথ্যমতে, এদিন সকাল আটটা পর্যন্ত গত এক দিনে দেশের তিন বিভাগে তিন শিশুর মৃত্যু হয়েছে। এর মধ্যে রাজধানী ঢাকা, উত্তর-পূর্বাঞ্চলের সিলেট এবং মধ্যাঞ্চলের ময়মনসিংহ বিভাগে একজন করে শিশু হামের উপসর্গ নিয়ে মারা গেছে।
চলতি বছরের ১৫ মার্চ থেকে দেশে হামের প্রকোপ ব্যাপকভাবে নজরে আসে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের দেওয়া পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ওই সময় থেকে এখন পর্যন্ত সরাসরি হামে আক্রান্ত হয়ে মৃত্যুর সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৯২ জনে। তবে এর চেয়েও বেশি ভয়াবহ চিত্র দেখা যাচ্ছে হামের উপসর্গ বা লক্ষণ নিয়ে মৃত্যুর ক্ষেত্রে। জ্বর, সর্দি, কাশি এবং গায়ে লাল ফুসকুড়ির মতো হামের সুস্পষ্ট উপসর্গ নিয়ে এখন পর্যন্ত মারা গেছে ৫৩৯ জন। সব মিলিয়ে হাম ও এর উপসর্গে প্রাণ হারানো মানুষের মোট সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৬৩১ জনে। মৃতদের প্রায় সবাই শিশু, যাদের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বয়স্কদের তুলনায় বেশ দুর্বল থাকে।
আক্রান্তের পরিসংখ্যানেও মিলছে ভয়াবহতার আভাস। সরকারি বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়েছে, কেবল গত ২৪ ঘণ্টাতেই হামের লক্ষণ নিয়ে হাসপাতালে চিকিৎসার জন্য ছুটে এসেছেন ৯৮০ জন রোগী। এই বিপুল সংখ্যক নতুন রোগীর উপস্থিতির কারণে সম্ভাব্য হাম আক্রান্তের মোট সংখ্যা এক লাফে ৮১ হাজার ৮৪ জনে পৌঁছেছে। প্রতিদিন এত সংখ্যক রোগীর হাসপাতালে আগমন দেশের চিকিৎসা কাঠামোর ওপর বড় ধরনের চাপ সৃষ্টি করছে।
লক্ষণ নিয়ে হাসপাতালে আসা রোগীদের মধ্যে পরীক্ষার পর সরাসরি হাম শনাক্ত হওয়ার সংখ্যাও একেবারে কম নয়। গত এক দিনে নতুন করে ৫৪ জনের শরীরে এই রোগের জীবাণু নিশ্চিতভাবে শনাক্ত হয়েছে। এর ফলে ১৫ মার্চ থেকে এখন পর্যন্ত দেশে নিশ্চিতভাবে হামে আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৯ হাজার ৮৩৩ জনে।
তবে এত দুঃসংবাদের মধ্যেও কিছুটা স্বস্তির খবর হলো, আক্রান্তদের বড় একটি অংশ চিকিৎসা শেষে সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরেছেন। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য বলছে, ১৫ মার্চ থেকে এখন পর্যন্ত হামের উপসর্গ নিয়ে দেশের বিভিন্ন সরকারি ও বেসরকারি হাসপাতালে ভর্তি হয়েছিলেন ৬৬ হাজার ১৭০ জন রোগী। চিকিৎসক ও স্বাস্থ্যকর্মীদের আপ্রাণ চেষ্টায় তাদের মধ্যে ৬২ হাজার ২৯২ জন ইতিমধ্যে সুস্থ হয়ে হাসপাতাল ছেড়েছেন। বাকি রোগীরা এখনও চিকিৎসাধীন রয়েছেন এবং তাদের নিবিড় পর্যবেক্ষণে রাখা হয়েছে।
দেশের হাসপাতালগুলোর শিশু ওয়ার্ডগুলোতে এখন রোগীদের উপচে পড়া ভিড়। শয্যা সংকটের কারণে অনেক হাসপাতালেই মেঝেতে রেখে শিশুদের চিকিৎসা দিতে হচ্ছে। চিকিৎসক ও নার্সরা দিনরাত এক করে সেবা দিয়ে গেলেও রোগীর চাপ সামলাতে তাদের রীতিমতো হিমশিম খেতে হচ্ছে। বিশেষ করে প্রত্যন্ত অঞ্চল থেকে আসা রোগীদের অবস্থা বেশি সংকটাপন্ন দেখা যাচ্ছে।
চিকিৎসা বিশেষজ্ঞরা জানাচ্ছেন, হাম মূলত একটি ভাইরাসজনিত এবং অত্যন্ত ছোঁয়াচে রোগ (যা সহজেই একজনের শরীর থেকে আরেকজনের শরীরে ছড়ায়)। আক্রান্ত শিশুর হাঁচি বা কাশির মাধ্যমে বাতাসের সাহায্যে এই ভাইরাসের জীবাণু চারপাশের পরিবেশে ছড়িয়ে পড়ে। সাধারণত যেসব শিশুর শরীরে পুষ্টির অভাব রয়েছে এবং যাদের সঠিক সময়ে হামের টিকা দেওয়া হয়নি, তারাই এই ভাইরাসের সহজ শিকারে পরিণত হচ্ছে।
হামের প্রাথমিক লক্ষণ হিসেবে শিশুর তীব্র জ্বর, সর্দি, চোখ লাল হয়ে যাওয়া এবং শুষ্ক কাশি দেখা দেয়। এর কয়েক দিন পরই শরীরের বিভিন্ন স্থানে লাল রঙের ছোট ছোট ফুসকুড়ি উঠতে শুরু করে। বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করে বলছেন, হাম নিজে যতটা না বিপজ্জনক, এর কারণে সৃষ্ট শারীরিক জটিলতাগুলো তার চেয়েও বেশি প্রাণঘাতী। হামে আক্রান্ত শিশুদের ক্ষেত্রে অনেক সময় মারাত্মক নিউমোনিয়া, মস্তিষ্কের পর্দায় প্রদাহ, অন্ধত্ব কিংবা তীব্র ডায়রিয়ার মতো জটিল রোগ দেখা দেয়। এই মৃত্যুর পরিসংখ্যানে যাদের কথা বলা হয়েছে, তাদের বড় অংশই মূলত এই ধরনের জটিলতার শিকার হয়ে প্রাণ হারিয়েছেন। তাই সন্তানের শরীরে জ্বরের সঙ্গে ফুসকুড়ি দেখা দেওয়া মাত্রই ঘরে বসে না থেকে দ্রুত নিকটস্থ হাসপাতাল বা চিকিৎসকের কাছে যাওয়ার জন্য কঠোর পরামর্শ দিয়েছেন শিশু বিশেষজ্ঞরা।
দেশে হাম ও এর উপসর্গে এত বিপুল সংখ্যক আক্রান্ত ও মৃত্যুর পরিসংখ্যান আমাদের টিকাদান কর্মসূচির ফাঁকফোকর এবং প্রান্তিক পর্যায়ে স্বাস্থ্যসচেতনতার অভাবকেই আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিচ্ছে। আধুনিক চিকিৎসা ব্যবস্থায় হাম একটি সম্পূর্ণ প্রতিরোধযোগ্য রোগ। সঠিক সময়ে শিশুদের হামের টিকা নিশ্চিত করা গেলে এই অকাল মৃত্যুগুলো সহজেই এড়ানো সম্ভব হতো। শিশুদের সুরক্ষায় টিকাদান শতভাগ নিশ্চিত করার পাশাপাশি অভিভাবকদের আরও বেশি সতর্ক হতে হবে। সরকারের উচিত এখনই আক্রান্ত এলাকাগুলোতে জরুরি ভিত্তিতে বিশেষ স্বাস্থ্যসেবা দল পাঠানো এবং দেশব্যাপী টিকাদান কর্মসূচি আরও জোরদার করা