সরকারের বিশেষ হাম টিকাদান কর্মসূচির ইতিবাচক প্রভাব পড়তে শুরু করেছে দেশের ১৮ জেলার ৩০টি হটস্পট উপজেলায়। টিকা দেওয়ার ফলে এসব এলাকায় হামের প্রকোপ নাটকীয়ভাবে কমে এসেছে এবং হাসপাতালে রোগী ভর্তির হারও উল্লেখযোগ্য হারে হ্রাস পেয়েছে।
চলতি বছরের এপ্রিল মাসের শুরুর দিকে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে হামের প্রাদুর্ভাব মহামারী আকার ধারণ করেছিল। বিশেষ করে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর কর্তৃক চিহ্নিত ১৮ জেলার ৩০টি উপজেলাকে হটস্পট ঘোষণা করা হয়। পরিস্থিতি সামাল দিতে গত ৫ এপ্রিল থেকে ৫ থেকে ৫৯ মাস বয়সী শিশুদের জন্য বিশেষ টিকাদান ক্যাম্পেইন শুরু করে সরকার। স্বাস্থ্য বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, এই কর্মসূচির ফলে বর্তমানে ওইসব এলাকায় হামের সংক্রমণ প্রায় নিয়ন্ত্রণে চলে এসেছে।
স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন জানিয়েছেন, যে ৩০টি উপজেলাকে ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছিল, সেখানে এখন হামে আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা নগণ্য। তিনি আরও জানান, শুধু নির্দিষ্ট হটস্পট নয়, বরং দেশব্যাপী হাম পরিস্থিতি এখন স্বাভাবিকের পথে। বিশেষ করে ১৭ এপ্রিলের পর থেকে রোগী ভর্তির সংখ্যা আশঙ্কাজনক হারে কমেছে, যা সরকারের গৃহীত টিকাদান কর্মসূচির কার্যকারিতাকেই প্রমাণ করে।
বিভিন্ন জেলা থেকে আসা তথ্য বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, চাঁপাইনবাবগঞ্জের মতো যেসব জেলায় মার্চের শেষভাগে প্রতিদিন প্রায় শতাধিক রোগী হাসপাতালে ভর্তি হতো, সেখানে এখন সংখ্যাটি ১০ জনের নিচে নেমে এসেছে। নাটোরের সিভিল সার্জন জানিয়েছেন, সদর উপজেলায় লক্ষ্যমাত্রার শতভাগ শিশুকে টিকা দেওয়া সম্ভব হয়েছে, যার ফলে শিশুদের রোগ প্রতিরোধক্ষমতা বেড়েছে এবং মৃত্যু বা জটিলতার কোনো খবর পাওয়া যায়নি। একইভাবে পাবনা সদর হাসপাতালেও মার্চ মাসের তুলনায় বর্তমান রোগী ভর্তির সংখ্যা অর্ধেকে নেমে এসেছে।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার প্রতিনিধি ডা. চিরঞ্জিত দাস ব্যাখ্যা করেছেন যে, টিকা নেওয়ার পর শরীরে রোগ প্রতিরোধক্ষমতা বা অ্যান্টিবডি তৈরি হতে সাধারণত দুই থেকে তিন সপ্তাহ সময় লাগে। তাই বর্তমান পরিস্থিতিতে টিকাদান কর্মসূচির সুফল দৃশ্যমান হতে শুরু করেছে। প্রধানমন্ত্রীর স্বাস্থ্যবিষয়ক বিশেষ সহকারী ড. এস এম জিয়াউদ্দিন হায়দার জানিয়েছেন, দেশের সার্বিক পরিস্থিতি এখন স্থিতিশীল। তবে টিকাদানের পূর্ণ সুফল পেতে আরও কয়েক সপ্তাহ ধৈর্যের প্রয়োজন বলে তিনি মত দেন।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক অধ্যাপক ডা. প্রভাত চন্দ্র বিশ্বাস জানিয়েছেন, প্রাথমিকভাবে সিটি করপোরেশনসহ অন্যান্য এলাকাগুলোতেও একই ধরনের ইতিবাচক পরিবর্তন লক্ষ্য করা যাচ্ছে। তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করেন যে, চলমান সচেতনতামূলক কর্মকাণ্ড ও টিকাদান কর্মসূচি অব্যাহত থাকলে হামের প্রাদুর্ভাব পুরোপুরি নির্মূল করা সম্ভব হবে।
হাম একটি প্রতিরোধযোগ্য রোগ, যার প্রকোপ থেকে বাঁচতে টিকাদানের কোনো বিকল্প নেই। স্বাস্থ্য বিভাগের এই সফল উদ্যোগ প্রমাণ করে যে, সঠিক সময়ে কার্যকর পদক্ষেপ নিলে জনস্বাস্থ্য সুরক্ষায় দ্রুত সুফল পাওয়া সম্ভব। তবে কেবল জরুরি অবস্থায় নয়, ভবিষ্যতে যাতে এই ধরনের রোগের বিস্তার না ঘটে, সেজন্য নিয়মিত টিকাদান কর্মসূচি ও মাঠপর্যায়ে স্বাস্থ্য সচেতনতা বজায় রাখা জরুরি। স্বাস্থ্যখাতে এমন সমন্বিত কার্যক্রমই একটি সুস্থ জাতি গঠনে মূল ভূমিকা রাখতে পারে।