দেশে আশঙ্কাজনক হারে হামের সংক্রমণ বৃদ্ধি পাওয়ায় এক কোটি ৭৮ লাখ শিশুকে টিকার আওতায় আনতে বিশেষ জরুরি কর্মসূচি শুরু করেছে সরকার। গতকাল সোমবার বগুড়ার গাবতলী থেকে এই বিশাল কর্মযজ্ঞের আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করা হয়, যার উদ্দেশ্য হলো প্রতিটি শিশুকে এই মরণব্যাধি থেকে সুরক্ষা দেওয়া।
সম্প্রতি দেশজুড়ে হাম ও রুবেলার প্রাদুর্ভাব দেখা দেওয়ায় জনমনে উদ্বেগ সৃষ্টি হয়েছে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সর্বশেষ তথ্যানুযায়ী, গত ১৫ মার্চ থেকে এখন পর্যন্ত হামে আক্রান্ত হয়ে ৩৭টি শিশু প্রাণ হারিয়েছে। এছাড়া উপসর্গ নিয়ে আরও ১৮৩ জনের মৃত্যুর খবর পাওয়া গেছে। বিশেষ করে ঢাকা বিভাগে সংক্রমণের হার সবচেয়ে বেশি হওয়ায় পরিস্থিতি মোকাবিলায় সরকার এই বিশেষ টিকাদান কর্মসূচি হাতে নিয়েছে।
গতকাল সোমবার দুপুরে বগুড়ার বাগবাড়ীতে জিয়াউর রহমান গ্রাম হাসপাতালে এই কর্মসূচির উদ্বোধন করেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। উদ্বোধনকালে তিনি মাঠ পর্যায়ের কর্মীদের কঠোর নির্দেশনা দিয়ে বলেন, দেশের একটি শিশুও যেন এই টিকার আওতা থেকে বাদ না পড়ে সেদিকে তীক্ষ্ণ নজর রাখতে হবে। অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে ডা. জোবাইদা রহমানসহ স্থানীয় ও কেন্দ্রীয় নেতৃবৃন্দ উপস্থিত ছিলেন।
সারাদেশে এই কার্যক্রম একযোগে শুরু হয়েছে। নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জে টিকা কার্যক্রম উদ্বোধনকালে স্বাস্থ্য ও পরিবারকল্যাণ মন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন বলেন, হাম এখনও মহামারি পর্যায়ে পৌঁছায়নি এবং যেসব এলাকায় প্রাদুর্ভাব বেশি সেখানে ইতোমধ্যে ৮৫ শতাংশ শিশুকে টিকার আওতায় আনা হয়েছে। তিনি আরও জানান, আগামী অর্থবছর থেকে ১৫ মাসের আগাম চাহিদা বিবেচনা করে টিকার মজুত নিশ্চিত করা হবে। অনুষ্ঠানে আন্তর্জাতিক সংস্থা ইউনিসেফের (জাতিসংঘের শিশু তহবিল) প্রতিনিধি ও মার্কিন দূতাবাসের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।
অন্যদিকে, সিরাজগঞ্জের শাহজাদপুরে স্বাস্থ্য প্রতিমন্ত্রী ড. এম এ মুহিত দেশের স্বাস্থ্য খাতের বর্তমান ভঙ্গুর দশা নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করেন। তিনি জানান, আগামী এক মাসের মধ্যে লক্ষ্যমাত্রা অনুযায়ী ১ কোটি ৭৮ লাখ শিশুকে টিকা দেওয়া সম্পন্ন হবে। ৫ মাস থেকে ৫৯ মাস বয়সী সকল শিশু এই কর্মসূচির অন্তর্ভুক্ত থাকবে।
টিকা নিয়ে বিভিন্ন সামাজিক কুসংস্কারের বিরুদ্ধে সতর্ক করেছেন মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ প্রতিমন্ত্রী সুলতান সালাউদ্দিন টুকু এবং প্রবাসীকল্যাণ মন্ত্রী আরিফুল হক চৌধুরী। স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা জানিয়েছেন, টিকা দেওয়ার পর সামান্য জ্বর হওয়া স্বাভাবিক এবং এটি নিয়ে আতঙ্কিত হওয়ার কিছু নেই। ইউনিসেফের প্রতিনিধি রানা ফ্লাওয়ার্স এক বিবৃতিতে জানান, দুই ডোজ টিকা নিলে শিশুদের সুরক্ষা প্রায় ৯৫ শতাংশ পর্যন্ত বৃদ্ধি পায়। তাই শিশুদের জীবন বাঁচাতে সময়মতো টিকা কেন্দ্রে নিয়ে আসার জন্য অভিভাবকদের প্রতি আহ্বান জানানো হয়েছে।
শিশুদের স্বাস্থ্য সুরক্ষা নিশ্চিত করা একটি উন্নত রাষ্ট্র গঠনের অন্যতম প্রধান শর্ত। হামের মতো প্রতিরোধযোগ্য রোগে শিশুদের মৃত্যু আমাদের সামগ্রিক স্বাস্থ্য ব্যবস্থার সীমাবদ্ধতাকেই আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেয়। সরকারি উদ্যোগের পাশাপাশি অভিভাবকদের সচেতনতা ও সঠিক সময়ে টিকা গ্রহণ নিশ্চিত করা গেলে এই সংকট থেকে দ্রুত মুক্তি পাওয়া সম্ভব। শিশুদের সুন্দর ভবিষ্যতের জন্য এই বিশেষ কর্মসূচি যেন আমলাতান্ত্রিক জটিলতায় বাধাগ্রস্ত না হয়, সেটিই এখন বড় প্রত্যাশা।