আশঙ্কাজনক হারে ছড়িয়ে পড়া ছোঁয়াচে রোগ হাম এবার তার চিরাচরিত চরিত্র বদলে ফেলেছে। অতীতে রেকর্ড না থাকলেও বর্তমানে মাত্র ছয় মাস বা তার চেয়েও কম বয়সি শিশুরা এই রোগে আক্রান্ত হওয়ায় জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ও চিকিৎসকদের মধ্যে চরম উদ্বেগ সৃষ্টি হয়েছে।
দেশে মারাত্মক সংক্রামক ব্যাধি হামের প্রাদুর্ভাব বর্তমানে এক জটিল পরিস্থিতির দিকে মোড় নিয়েছে। রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন হাসপাতালগুলোতে শয্যা সংখ্যার তুলনায় অনেক বেশি রোগী ভর্তি হচ্ছে। সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় হলো, হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে আসা শিশুদের একটি বড় অংশই নয় মাসের কম বয়সি। চিকিৎসা বিজ্ঞানের প্রচলিত ধারণা ও দীর্ঘদিনের অভিজ্ঞতাকে চ্যালেঞ্জ জানিয়ে এবার ছয় মাসের কম বয়সি শিশুদের শরীরেও হামের সংক্রমণ দেখা দিচ্ছে। এর ফলে অভিভাবক ও চিকিৎসকদের মধ্যে নতুন করে দুশ্চিন্তা দানা বেঁধেছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, সাধারণত শিশুদের নয় মাস পূর্ণ হলে হামের টিকা দেওয়া হয় এবং মায়ের শরীর থেকে পাওয়া রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা (অ্যান্টিবডি) শিশুকে নির্দিষ্ট সময় পর্যন্ত সুরক্ষা দেয়। তবে এবারের পরিস্থিতি সম্পূর্ণ ভিন্ন। শিশু সংক্রামক রোগ বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক চিকিৎসক মীর্জা মো. জিয়াউল ইসলাম জানান, চিকিৎসা বিজ্ঞানের স্বীকৃত তথ্য অনুযায়ী ছয় মাসের কম বয়সি শিশুদের সাধারণত হাম হওয়ার কথা নয়। অথচ চলতি বছর অস্বাভাবিকভাবে এখন পর্যন্ত ৬০ জন শিশু পাওয়া গেছে যাদের বয়স ছয় মাসেরও কম। পাশাপাশি ছয় থেকে নয় মাস বয়সি আরও ৬৫ জন শিশু আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে এসেছে। ইতিপূর্বে এই সংখ্যা ছিল প্রায় শূন্যের কোঠায়। বয়সভিত্তিক সংক্রমণের এই পরিবর্তন চিকিৎসকদের রীতিমতো হতবাক করে দিয়েছে।
হামের এই রহস্যময় চরিত্র পরিবর্তনের পেছনে ভাইরাসের নতুন কোনো ধরন দায়ী কি না, তা নিয়ে ইতিমধ্যেই গবেষণা শুরু হয়েছে। যদিও বিশেষজ্ঞরা এখনই একে 'নতুন ধরন' হিসেবে ঘোষণা করতে রাজি নন। জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক মুশতাক হোসেনের মতে, কেবল বাংলাদেশে নয়, বিশ্বের আরও কিছু দেশেও শিশুদের মধ্যে এমন সংক্রমণের প্রবণতা দেখা যাচ্ছে। তবে আশার কথা হলো, বর্তমানে বিদ্যমান টিকাগুলো এখনও কার্যকর রয়েছে। যদি ভাইরাসের আমূল পরিবর্তন ঘটে থাকে, তবে টিকার ধরনেও পরিবর্তন আনতে হতে পারে। তবে এই রহস্যের চূড়ান্ত ফলাফল পেতে আরও অন্তত ছয় মাস সময় লাগতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
হাসপাতালগুলোতে হামে আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা বাড়তে থাকায় স্বাস্থ্য বিভাগকে দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়ার আহ্বান জানানো হয়েছে। চিকিৎসকরা পরামর্শ দিচ্ছেন, বর্তমান পরিস্থিতিতে শিশুদের নিয়মিত টিকাদান কর্মসূচির আওতায় আনা এবং আক্রান্ত শিশুদের ক্ষেত্রে বিশেষ সাবধানতা অবলম্বন করা অত্যন্ত জরুরি। যেহেতু রোগটি অত্যন্ত ছোঁয়াচে, তাই আক্রান্ত শিশুকে আলাদা রাখা এবং যথাযথ স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলা ছাড়া বিকল্প নেই।
: হামের মতো একটি চেনা রোগ যখন তার গতিপ্রকৃতি বদলে ফেলে, তখন তা আমাদের জনস্বাস্থ্য কাঠামোর জন্য বড় পরীক্ষা হয়ে দাঁড়ায়। ছয় মাসের কম বয়সি শিশুদের আক্রান্ত হওয়া ইঙ্গিত দেয় যে, আমাদের টিকাদান কর্মসূচি ও মায়েদের স্বাস্থ্যের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা নিয়ে নতুন করে ভাবার সময় এসেছে। ভাইরাসের এই রূপবদল মোকাবিলায় গবেষণার পাশাপাশি অভিভাবকের সচেতনতা এবং সরকারি নজরদারি আরও জোরদার করা এখন সময়ের দাবি।