সারাদেশে হাম পরিস্থিতি ক্রমেই উদ্বেগজনক রূপ নিচ্ছে। গত ২৪ ঘণ্টায় হামের উপসর্গ নিয়ে নতুন করে আরও ছয়জনের প্রাণহানি ঘটেছে। চলতি বছরের মার্চের মাঝামাঝি সময় থেকে এ পর্যন্ত সন্দেহভাজন রোগীর সংখ্যা ৫০ হাজার ছাড়িয়ে যাওয়া জনস্বাস্থ্যের জন্য একটি বড় অশনিসংকেত হিসেবে দেখছেন সংশ্লিষ্টরা।
সোমবার (১১ মে) বিকেলে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের স্বাস্থ্য জরুরি কার্যক্রম কেন্দ্র ও নিয়ন্ত্রণ কক্ষ থেকে দেশের বর্তমান হাম পরিস্থিতি নিয়ে সর্বশেষ তথ্য প্রকাশ করা হয়। প্রকাশিত ওই সরকারি তথ্য অনুযায়ী, দেশে হামের প্রকোপ এক ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে। সর্বশেষ ২৪ ঘণ্টায় হামের মতো উপসর্গ নিয়ে অন্তত ছয়জন মৃত্যুবরণ করেছেন। তবে স্বস্তির বিষয় হলো, এই নির্দিষ্ট সময়ে নিশ্চিতভাবে হামে আক্রান্ত হয়ে নতুন করে কারও মৃত্যুর খবর পাওয়া যায়নি।
পরিসংখ্যান বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, চলতি বছরের ১৫ মার্চের পর থেকে দেশে হামের বিস্তার আশঙ্কাজনক হারে বেড়েছে। এই সময়ের মধ্যে সন্দেহভাজন হাম রোগীর সংখ্যা ৫০ হাজার ৫০০ জনে পৌঁছেছে। অন্যদিকে, যথাযথ পরীক্ষানিরীক্ষার পর নিশ্চিতভাবে হামে আক্রান্ত বলে শনাক্ত হয়েছেন ৬ হাজার ৯৩৭ জন। এতো বিপুল সংখ্যক মানুষের আকস্মিক আক্রান্ত হওয়ার ঘটনা দেশের চিকিৎসাব্যবস্থার ওপর বড় ধরনের চাপ সৃষ্টি করছে।
সংক্রমণের পাশাপাশি মৃত্যুর পরিসংখ্যান আরও বেশি হৃদয়বিদারক। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের দেওয়া তথ্যমতে, ১৫ মার্চের পর থেকে এ পর্যন্ত নিশ্চিতভাবে হামে আক্রান্ত হয়ে ৬৫ জনের মৃত্যু হয়েছে। তবে হামের উপসর্গ নিয়ে সন্দেহভাজন মৃত্যুর সংখ্যা এর চেয়ে অনেক বেশি, যা প্রায় ৩৫০ জন। এই বিশাল ব্যবধান প্রমাণ করে যে, হামের উপসর্গ নিয়ে অনেকেই সঠিক চিকিৎসার অভাবে বা রোগ নির্ণয়ের আগেই মারা যাচ্ছেন।
সারাদেশের হাসপাতালগুলোতে রোগীদের উপচে পড়া ভিড় লক্ষ্য করা যাচ্ছে। এখন পর্যন্ত হাম সন্দেহে দেশের বিভিন্ন হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে ভর্তি হয়েছেন ৩৫ হাজার ৯৮০ জন। চিকিৎসকদের নিরলস প্রচেষ্টায় এদের মধ্যে ৩১ হাজার ৯৯২ জন সুস্থ হয়ে হাসপাতাল থেকে ছাড়পত্র পেয়েছেন (বাড়ি ফিরে গেছেন)। তবে এখনও হাজার হাজার রোগী হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রয়েছেন, যাদের সুস্থ করে তুলতে স্বাস্থ্যকর্মীদের আক্ষরিক অর্থেই হিমশিম খেতে হচ্ছে।
হাম পরিস্থিতি নিয়ে এর আগে স্বাস্থ্যমন্ত্রী গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করে জানিয়েছিলেন যে, পরিস্থিতি পুরোপুরি স্বাভাবিক হতে বেশ কিছুটা সময় লাগতে পারে। অন্যদিকে, হামে আক্রান্ত হয়ে মৃত ৩৫২ জন শিশুর পরিবারকে ক্ষতিপূরণ দেওয়ার নির্দেশনা চেয়ে উচ্চ আদালতে একটি রিট (আইনি আবেদন) দায়ের করা হয়েছে। এই আইনি পদক্ষেপ বুঝিয়ে দেয়, হামের কারণে ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলো কতটা অসহায় অবস্থার মধ্য দিয়ে যাচ্ছে এবং রাষ্ট্রের কাছে তাদের ন্যায়বিচারের প্রত্যাশা কতটুকু।
জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, হাম ভাইরাসজনিত একটি অতি সংক্রামক রোগ। সাধারণত আক্রান্ত ব্যক্তির হাঁচি-কাশির মাধ্যমে এটি বাতাসে ছড়িয়ে পড়ে এবং খুব সহজেই সুস্থ মানুষকে সংক্রমিত করে। জ্বর, সর্দি, কাশি, চোখ লাল হওয়া এবং শরীরে লালচে দানা বা র্যাশ ওঠা— এগুলোই হলো হামের প্রাথমিক লক্ষণ। দেশে সম্প্রসারিত টিকাদান কর্মসূচির অধীনে শিশুদের নিয়মিত হামের টিকা দেওয়া হলেও, কোনো কারণে যারা এই টিকার আওতার বাইরে থেকে যাচ্ছে, তারাই বর্তমানে সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে রয়েছে। প্রত্যন্ত অঞ্চলে স্বাস্থ্যসেবার অপ্রতুলতা এবং অভিভাবকদের অসচেতনতার কারণে অনেক শিশু সঠিক সময়ে টিকা পাচ্ছে না, যার চূড়ান্ত পরিণতি হিসেবে আজ এতো মানুষের প্রাণহানি ঘটছে।
একটি স্বাধীন ও উন্নয়নশীল দেশে হামের মতো শতভাগ প্রতিরোধযোগ্য রোগে এতো বিপুল সংখ্যক মানুষের আক্রান্ত হওয়া ও মৃত্যুর ঘটনা জনস্বাস্থ্য ব্যবস্থাপনার একটি বড় দুর্বলতা চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেয়। টিকাদান কর্মসূচির বৈশ্বিক সফলতা নিয়ে আমরা যখন গর্ব করি, ঠিক তখনই হামের এমন লাগামহীন প্রাদুর্ভাব আমাদের নতুন করে ভাবতে বাধ্য করে। এই পরিস্থিতি থেকে উত্তরণের জন্য শুধু হাসপাতালে চিকিৎসাসেবা বৃদ্ধি করাই যথেষ্ট নয়; বরং দেশব্যাপী টিকাদান কর্মসূচির শূন্যস্থানগুলো (যেসব এলাকায় টিকাদানের হার কম) খুঁজে বের করে জরুরি ভিত্তিতে তা পূরণ করা প্রয়োজন। এখন পাঠকের কাছে প্রশ্ন— আমাদের ব্যক্তিগত অসচেতনতা নাকি স্বাস্থ্য খাতের কাঠামোগত দুর্বলতা, কোনটি এই ভয়াবহ পরিস্থিতির জন্য বেশি দায়ী? আগামী প্রজন্মকে সুরক্ষিত রাখতে আজই কি আমাদের আরও কঠোর ও সমন্বিত পদক্ষেপ নেওয়া উচিত নয়?