দেশে হামের প্রাদুর্ভাব ক্রমশ ভয়াবহ রূপ নিচ্ছে। গত ২৪ ঘণ্টায় হামে আক্রান্ত হয়ে আরও তিন শিশুর মৃত্যু হয়েছে এবং ভাইরাসটির উপসর্গ নিয়ে মারা গেছেন আরও চারজন। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, সারা দেশে আক্রান্তের সংখ্যা দ্রুত বাড়ছে।
বৃহস্পতিবার স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের নিয়মিত বুলেটিনে জানানো হয়, গত ১৫ মার্চ থেকে এখন পর্যন্ত হামে আক্রান্ত হয়ে ৮৩টি শিশুর মৃত্যু হয়েছে। পাশাপাশি, হামের উপসর্গ নিয়ে প্রাণ হারিয়েছেন আরও ৪০৫ জন। সব মিলিয়ে এই ভাইরাসটি এখন জনস্বাস্থ্যের জন্য বড় উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
তথ্য বিশ্লেষণে দেখা গেছে, হামের প্রাদুর্ভাব সবচেয়ে বেশি ঢাকা বিভাগে। এই বিভাগে এখন পর্যন্ত সর্বোচ্চ ১৬০ জন মারা গেছে। এরপরই রয়েছে রাজশাহী বিভাগ, যেখানে প্রাণহানির সংখ্যা ৭৮। অন্যান্য বিভাগের মধ্যে সিলেটে ৪০, চট্টগ্রামে ৩৯, ময়মনসিংহে ৩৪, বরিশালে ২৯, খুলনায় ২১ এবং রংপুরে ৪ জন মারা গেছে। এই পরিসংখ্যান প্রমাণ করে যে, দেশের প্রতিটি প্রান্তেই ভাইরাসটি ছড়িয়ে পড়েছে।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তর আরও জানায়, গত ২৪ ঘণ্টায় নতুন করে ২০৮ জনের শরীরে এই রোগ শনাক্ত হয়েছে। একই সময়ে হামের উপসর্গ বা লক্ষণ নিয়ে মোট ১ হাজার ৪২৩ জন রোগী হাসপাতালে এসেছেন। তাদের মধ্যে ১ হাজার ২৭৯ জনকে জরুরিভিত্তিতে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে। কেবল ঢাকাতেই গত ২৪ ঘণ্টায় ৫১৭ জন রোগী হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে, যা অন্য যেকোনো বিভাগের তুলনায় অনেক বেশি। অন্যদিকে, সবচেয়ে কম সংখ্যক রোগী ভর্তি হয়েছে রংপুর বিভাগে, যার সংখ্যা ১৫।
এখন পর্যন্ত পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, সারা দেশে মোট ৫৯ হাজার ২৭৯ জন রোগী এই রোগের উপসর্গ নিয়ে চিকিৎসকের শরণাপন্ন হয়েছেন। এর মধ্যে ল্যাবরেটরিতে পরীক্ষার মাধ্যমে নিশ্চিতভাবে ৮ হাজার ২৭৫ জনের শরীরে হাম শনাক্ত হয়েছে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে স্বাস্থ্য বিভাগ কাজ করে যাচ্ছে বলে জানানো হলেও, আক্রান্তের ক্রমবর্ধমান হার সাধারণ মানুষের মধ্যে আতঙ্ক বাড়িয়ে তুলেছে। বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, দ্রুত টিকাদান কর্মসূচি জোরদার করা এবং জনসচেতনতা বৃদ্ধি না করা গেলে এই সংকট আরও ঘনীভূত হতে পারে।
হাম একটি অত্যন্ত ছোঁয়াচে ভাইরাসজনিত রোগ। জ্বর, কাশি, সর্দি এবং শরীরে লালচে দানা বা ফুসকুড়ি এই রোগের প্রধান লক্ষণ। সঠিক সময়ে চিকিৎসা না নিলে এবং প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ না করলে এটি শিশুদের জন্য মারাত্মক প্রাণঘাতী হয়ে উঠতে পারে। তাই শিশুদের স্বাস্থ্যের বিষয়ে অভিভাবকদের আরও সতর্ক থাকা প্রয়োজন।
হামের মতো একটি প্রতিরোধযোগ্য রোগে এত শিশুর প্রাণহানি অত্যন্ত বেদনাদায়ক এবং উদ্বেগজনক। আমাদের স্বাস্থ্য অবকাঠামোর সীমাবদ্ধতা এবং সচেতনতার অভাবই কি এই পরিস্থিতির জন্য দায়ী? শুধু আক্রান্তদের চিকিৎসা নয়, বরং শতভাগ টিকাদান নিশ্চিত করার মাধ্যমেই কেবল এই ভাইরাসের বিস্তার রোধ করা সম্ভব। আগামীর সুরক্ষায় আমাদের এখনই সম্মিলিত উদ্যোগ নিতে হবে, যাতে কোনো শিশুই আর অকালে ঝরে না পড়ে।