দেশে আশঙ্কাজনক হারে বাড়ছে হামের প্রাদুর্ভাব। গত ২৪ ঘণ্টায় হাম ও হামের উপসর্গ নিয়ে আরও ১০টি শিশু মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়েছে। এর মধ্যে চারজনের মৃত্যু নিশ্চিতভাবে হামের কারণে হয়েছে বলে জানিয়েছে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে হিমশিম খাচ্ছে হাসপাতালগুলো, যেখানে প্রতিদিন শত শত শিশু ভর্তি হচ্ছে।
সারা দেশে শিশুস্বাস্থ্যের ওপর হামের এক কালো ছায়া নেমে এসেছে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সর্বশেষ প্রতিবেদন অনুযায়ী, ১১ এপ্রিল সকাল আটটা থেকে ১২ এপ্রিল সকাল আটটা পর্যন্ত এই ২৪ ঘণ্টায় নতুন করে ১০ জন শিশুর মৃত্যু হয়েছে। এই মৃত্যুর ঘটনাগুলো দেশের স্বাস্থ্যব্যবস্থায় এক ধরনের জরুরি অবস্থার সংকেত দিচ্ছে। অধিদপ্তর নিশ্চিত করেছে যে, মৃত শিশুদের মধ্যে চারজন সরাসরি হামে আক্রান্ত ছিল। বাকি ছয়জন মারা গেছে হামের তীব্র উপসর্গ (শরীরে লালচে দানা বা প্রচণ্ড জ্বরের মতো লক্ষণ) নিয়ে।
মৃত শিশুদের ভৌগোলিক অবস্থান বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, রাজধানীর পরিস্থিতি সবচেয়ে ভয়াবহ। গত ২৪ ঘণ্টায় যে চার শিশু নিশ্চিতভাবে হামে মারা গেছে, তারা সবাই ঢাকা বিভাগের। এছাড়া উপসর্গ নিয়ে মারা যাওয়া ছয় শিশুর মধ্যে পাঁচজনই ঢাকার এবং একজন খুলনা বিভাগের বাসিন্দা। কেবল ঢাকা বিভাগেই নতুন করে ১২৩ জনের শরীরে হামের জীবাণু শনাক্ত হয়েছে, যা সারা দেশের মধ্যে সর্বোচ্চ। এর বিপরীতে
রাজশাহী বিভাগে ২১ জন শনাক্ত হলেও চট্টগ্রাম ও সিলেটে সংক্রমণের হার তুলনামূলক কম দেখা গেছে।
হাসপাতালগুলোর চিত্র এখন বেশ করুণ। গত এক দিনে সারা দেশে ১ হাজার ২৬৮ জন শিশু হামের বিভিন্ন উপসর্গ নিয়ে চিকিৎসকের শরণাপন্ন হয়েছে। এর মধ্যে অর্ধেকের বেশি অর্থাৎ ৫৮০ জনই ঢাকা বিভাগের। বর্তমানে দেশের বিভিন্ন হাসপাতালে হামের লক্ষণ নিয়ে ভর্তি হয়েছে ৭৬২ জন শিশু। রাজধানীর হাসপাতালগুলোতে তিল ধারণের জায়গা নেই। ঢাকা বিভাগের পর সর্বোচ্চ রোগী ভর্তি হয়েছে চট্টগ্রাম ও খুলনা অঞ্চলে, যেখানে রংপুর ও ময়মনসিংহে এই সংখ্যাটি কিছুটা কম। তবে আশার কথা হলো, গত ২৪ ঘণ্টায় ৬৩৪ জন শিশু সুস্থ হয়ে হাসপাতাল থেকে বাড়িতে ফিরেছে।
গত ১৫ মার্চ থেকে শুরু হওয়া এই প্রাদুর্ভাবের ২৯ দিনের খতিয়ান পর্যালোচনা করলে একটি আতঙ্কিত চিত্র ফুটে ওঠে। এই এক মাসেরও কম সময়ে হামে আক্রান্ত হয়ে দেশে মোট ২৮টি শিশুর মৃত্যু হয়েছে। তবে উপসর্গসহ হিসাব করলে এই সংখ্যাটি দাঁড়ায় ১৫১ জনে। গত ২৯ দিনে মোট ১৫ হাজার ৬৫৩ জন শিশু হামের লক্ষণ নিয়ে চিকিৎসকের কাছে এসেছে, যাদের মধ্যে ১০ হাজার ২২৫ জনকে হাসপাতালে ভর্তি করতে হয়েছে। এই দীর্ঘ সময়ে ২ হাজার ৬৩৯ জনের শরীরে নিশ্চিতভাবে হামের ভাইরাসের উপস্থিতি পাওয়া গেছে।
স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, হাম একটি অত্যন্ত সংক্রামক ভাইরাসজনিত রোগ যা মূলত শ্বাসপ্রশ্বাসের মাধ্যমে ছড়ায়। শিশুদের ক্ষেত্রে এটি মারাত্মক হতে পারে যদি সঠিক সময়ে টিকা দেওয়া না হয়। বর্তমান পরিস্থিতিতে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর মাঠ পর্যায়ে টিকাদান কর্মসূচি জোরদার করার ওপর গুরুত্ব দিচ্ছে। তবে সংক্রমণের যে ঊর্ধ্বগতি দেখা যাচ্ছে, তাতে সাধারণ মানুষের মধ্যে চরম আতঙ্ক বিরাজ করছে। বিশেষ করে ঘনবসতিপূর্ণ এলাকাগুলোতে এই রোগ দ্রুত ছড়িয়ে পড়ছে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
হামের মতো একটি প্রতিরোধযোগ্য রোগে এত বিপুল সংখ্যক শিশুর মৃত্যু আমাদের জনস্বাস্থ্য ব্যবস্থার জন্য একটি বড় সতর্কবার্তা। টিকাদান কর্মসূচির সফলতা সত্ত্বেও কেন এত শিশু আক্রান্ত হচ্ছে, তা গভীরভাবে খতিয়ে দেখা প্রয়োজন। অনেক ক্ষেত্রে অসচেতনতা বা সময়মতো টিকা না দেওয়ার কারণে শিশুদের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কমে যায়। অভিভাবকদের উচিত শিশুর শরীরে কোনো ধরনের লালচে দানা বা তীব্র জ্বর দেখা দিলে দেরি না করে নিকটস্থ হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া। একইসঙ্গে সরকারের পক্ষ থেকে জরুরি ভিত্তিতে বিশেষ টিকাদান ক্যাম্পেইন (গণটিকাদান কর্মসূচি) চালু করা এখন সময়ের দাবি। প্রতিটি শিশুর জীবন রক্ষা করা আমাদের নৈতিক দায়িত্ব, আর তার জন্য প্রয়োজন সামাজিক সচেতনতা ও সরকারি তৎপরতার সমন্বয়।