দীর্ঘ দুই যুগ পর ফুটবলের বিশ্বমঞ্চে আবারও ফিরছে তুরস্ক। সর্বশেষ ২০০২ সালে সেমিফাইনাল খেলে বিশ্বকে চমকে দেওয়া সেই তুর্কিরা এবার ইতালিয়ান কোচের হাত ধরে নতুন এক স্বপ্নের জাল বুনছে। তরুণ ও অভিজ্ঞদের সমন্বয়ে গড়া এই দলটি কি পারবে আবারও সেই রূপকথার পুনরাবৃত্তি ঘটাতে?
ফুটবলের ইতিহাসে ২০০২ সালের সেই সোনালী মুহূর্তগুলো তুরস্কের ফুটবল প্রেমীদের মনে আজও অমলিন। সেবার সেমিফাইনালে পরাক্রমশালী ব্রাজিলের ঘাম ঝরিয়ে ছেড়েছিল তুর্কি যোদ্ধারা। এরপর একে একে পাঁচটি বিশ্বকাপ পার হয়ে গেলেও মূল আসরে জায়গা করে নিতে পারেনি তারা। অবশেষে ইতালিয়ান ফুটবল গুরু ভিনসেনজো মন্টেলার জাদুকরী ছোঁয়ায় সেই আক্ষেপ ঘুচেছে। ২০২৬ সালের ফুটবল মহাযজ্ঞে যোগ দেওয়ার মাধ্যমে তুরস্ক এখন বিশ্ব ফুটবলের এক নতুন 'ডার্ক হর্স' (অপ্রত্যাশিত শক্তিশালী প্রতিযোগী) হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে।
বর্তমান তুরস্ক দলের এই আমূল পরিবর্তনের নেপথ্য কারিগর কোচ মন্টেলা। দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকেই তিনি দলকে তথাকথিত তারকা নির্ভরতা থেকে বের করে একটি শক্তিশালী ইউনিটে পরিণত করেছেন। তার অধীনে গত আড়াই বছরে তুরস্কের জয়ের হার প্রায় ৬০ শতাংশ। ইতালিয়ান কৌশলের আদলে তিনি প্রথমে রক্ষণভাগকে একটি দুর্ভেদ্য দেয়ালে পরিণত করেছেন, যার ফলশ্রুতিতে গোল হজমের হার উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে। রক্ষণভাগের সেনানি মেরিহ দেমিরাল ও আব্দুলকেরিম বারদাকসিরা বর্তমানে যেকোনো বিশ্বসেরা আক্রমণভাগকে রুখে দেওয়ার ক্ষমতা রাখেন।
তবে তুরস্কের মূল হৃদপিণ্ড হলো তাদের মাঝমাঠ। অভিজ্ঞ হাকান কালহানোগলুর ঠান্ডা মাথার পরিচালনা আর তরুণ বিস্ময় আর্দা গুলারের সৃষ্টিশীল পাসিং প্রতিপক্ষকে দিশেহারা করে দেওয়ার জন্য যথেষ্ট। বলের দখল রাখা এবং দ্রুত পাল্টা আক্রমণে যাওয়ার ক্ষেত্রে এই মাঝমাঠই দলটিকে নিয়ন্ত্রণ এনে দেয়। যদিও আক্রমণে এখনো একজন জাত গোলদাতার কিছুটা অভাব অনুভূত হচ্ছে, তবুও কেনান ইলদিজ ও বারিস আলপার ইলমাজের মতো গতিশীল তরুণরা যেকোনো রক্ষণভাগ তছনছ করে দিতে সক্ষম।
পরিসংখ্যানের পাতায় তাকালে দেখা যায়, জার্মানি ও ক্রোয়েশিয়ার মতো শক্তিশালী দেশগুলোকে হারিয়ে তুরস্ক নিজেদের সামর্থ্যের প্রমাণ দিয়েছে। যদিও অস্ট্রিয়ার কাছে বড় ব্যবধানে হার কিংবা পর্তুগালের কাছে পরাস্ত হওয়া তাদের কিছু দুর্বলতাকে সামনে এনেছে, তবুও ইউরো আসরের কোয়ার্টার ফাইনালে ওঠার অভিজ্ঞতা তাদের আত্মবিশ্বাসকে তুঙ্গে রেখেছে। কোচ মন্টেলার ৪-২-৩-১ কৌশলী বিন্যাস বা ফরমেশন (খেলোয়াড়দের সাজানোর পদ্ধতি) দলকে পরিস্থিতি অনুযায়ী খাপ খাইয়ে নিতে সাহায্য করে।
বিশ্বকাপের গ্রুপ পর্বে তুরস্ককে মোকাবিলা করতে হবে যুক্তরাষ্ট্র, অস্ট্রেলিয়া ও প্যারাগুয়ের মতো শক্তিশালী প্রতিপক্ষকে। শারীরিক সক্ষমতায় এগিয়ে থাকা অস্ট্রেলিয়া কিংবা গতিশীল ফুটবলে অভ্যস্ত যুক্তরাষ্ট্রের বিপক্ষে জয় ছিনিয়ে আনা সহজ হবে না। তবে মাঝমাঠের দখল ধরে রেখে রক্ষণে শৃঙ্খলা বজায় রাখতে পারলে নকআউট (হারলে বিদায় এমন পর্যায়) পর্বে ওঠা তুর্কিদের জন্য অসম্ভব কিছু নয়।
তুরস্কের বর্তমান দলটি শুধু অভিজ্ঞতার ওপর দাঁড়িয়ে নেই, বরং তাদের রয়েছে তারুণ্যের তেজ। ফুটবল বিশ্বে কোনো বড় দলের পতন ঘটাতে হলে যে ধরণের লড়াকু মানসিকতা প্রয়োজন, তা এই দলটির রন্ধ্রে রন্ধ্রে মিশে আছে। মাঠের লড়াইয়ে তারা কতটা স্নায়ুচাপ সামলাতে পারে, তার ওপরই নির্ভর করছে ২০০২ সালের সেই হারানো গৌরব ফিরে পাওয়া। বিশ্বমঞ্চে কি তবে নতুন কোনো তুর্কি রূপকথা লেখা হতে চলেছে? উত্তর মিলবে মাঠের লড়াইয়েই।