সারাদেশে হামের প্রকোপ দিন দিন উদ্বেগজনক পর্যায়ে পৌঁছেছে। গত ২৪ ঘণ্টায় এই সংক্রামক ব্যাধিতে আক্রান্ত হয়ে এবং এর উপসর্গ নিয়ে দেশে আরও ছয়জনের মৃত্যু হয়েছে। এদের মধ্যে দুইজনের শরীরে হামের উপস্থিতি নিশ্চিত হওয়া গেলেও বাকি চারজন মারা গেছেন এই রোগের স্পষ্ট লক্ষণ নিয়ে।
দেশের জনস্বাস্থ্য পরিস্থিতিতে নতুন করে দুশ্চিন্তার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে হামের (একটি ছোঁয়াচে ভাইরাসজনিত রোগ) সংক্রমণ। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের দেওয়া সর্বশেষ তথ্যানুযায়ী, গত ১৫ মার্চ থেকে শুরু হওয়া সংক্রমণের ধারা এখন আরও তীব্র হয়েছে। গত একদিনেই প্রাণ হারিয়েছেন ৬ জন, যা সাধারণ মানুষের মধ্যে আতঙ্ক বাড়িয়ে দিয়েছে। সরকারি হিসাব মতে, গত কয়েক সপ্তাহে হামে আক্রান্ত হয়ে মোট ১৬ জনের মৃত্যু নিশ্চিত করা হয়েছে। তবে উদ্বেগের বিষয় হলো, হামের মতো উপসর্গ বা লক্ষণ নিয়ে মারা যাওয়া মানুষের সংখ্যা এখন প্রায় একশ ছুঁইছুঁই। অধিদপ্তরের তথ্যমতে, এ পর্যন্ত ৯৮ জন মানুষ মারা গেছেন যাদের শরীরে হামের স্পষ্ট লক্ষণ বিদ্যমান ছিল।
শনিবার স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের পক্ষ থেকে প্রকাশিত নিয়মিত স্বাস্থ্য বুলেটিনে (বিশেষ তথ্য বিবরণী) জানানো হয়েছে যে, গত ২৪ ঘণ্টায় যারা মারা গেছেন তাদের মধ্যে ঢাকার বিভিন্ন হাসপাতালে দুইজনের মৃত্যু হয়েছে। এছাড়া ঢাকার পার্শ্ববর্তী জেলা টাঙ্গাইলে সর্বোচ্চ দুইজনের মৃত্যু রেকর্ড করা হয়েছে। যদিও মৃতদের বয়স বা ব্যক্তিগত পরিচয় বিস্তারিতভাবে প্রকাশ করা হয়নি, তবে এই পরিসংখ্যানটি দেশের চিকিৎসা ব্যবস্থার ওপর ক্রমবর্ধমান চাপের ইঙ্গিত দিচ্ছে। বিভাগীয় পরিসংখ্যান বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, এ পর্যন্ত সবচেয়ে বেশি প্রাণহানির ঘটনা ঘটেছে উত্তরবঙ্গের রাজশাহী বিভাগে। সেখানে হামের উপসর্গ নিয়ে ৫০ জন মারা গেছেন। এর পরেই রয়েছে ঢাকা বিভাগ, যেখানে মৃত্যুর সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৩৮ জনে।
বিগত ২৪ ঘণ্টার আক্রান্তের পরিসংখ্যানও বেশ আশঙ্কাজনক। একদিনেই নতুন করে ৬০ জনের শরীরে হামের সংক্রমণ শনাক্ত হয়েছে। তবে লক্ষণ নিয়ে হাসপাতালে আসা রোগীর সংখ্যা এর চেয়ে বহুগুণ বেশি। বুলেটিন অনুযায়ী, গত একদিনে ৭৮৭ জন রোগী হামের উপসর্গ নিয়ে চিকিৎসার জন্য এসেছেন। এদের মধ্যে শারীরিক অবস্থা বিবেচনা করে ৪৮৮ জনকে দেশের বিভিন্ন হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে। রাজধানীর হাসপাতালগুলোর অবস্থা সবচেয়ে করুণ; কেবল ঢাকাতেই গত ২৪ ঘণ্টায় ৩১৫ জন রোগী হাসপাতালে ভর্তি হতে বাধ্য হয়েছেন। এর বিপরীতে ময়মনসিংহে তুলনামূলক কম, মাত্র ৪ জন রোগী ভর্তির খবর পাওয়া গেছে।
গত ১৫ মার্চ থেকে এ পর্যন্ত সামগ্রিক চিত্র পর্যবেক্ষণ করলে দেখা যায়, দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে ৬ হাজার ৪৭৬ জন মানুষ হামের উপসর্গ নিয়ে চিকিৎসকদের শরণাপন্ন হয়েছেন। এদের মধ্যে পরীক্ষা-নিরীক্ষার মাধ্যমে ৮২৬ জনের শরীরে নিশ্চিতভাবে হামের উপস্থিতি শনাক্ত করা গেছে। আক্রান্তদের একটি বড় অংশকেই দীর্ঘমেয়াদী চিকিৎসার জন্য হাসপাতালে থাকতে হচ্ছে। প্রাপ্ত তথ্যমতে, এ পর্যন্ত মোট ৪ হাজার ৬২৮ জন রোগী হাসপাতালে শয্যাশায়ী হয়েছেন, যাদের মধ্যে সুস্থ হয়ে বাড়িতে ফিরেছেন ২ হাজার ৬৫৪ জন। বাকিরা এখনও জীবন-মৃত্যুর সন্ধিক্ষণে হাসপাতালের বিছানায় লড়ছেন।
বিশেষজ্ঞদের মতে, হাম একটি তীব্র ছোঁয়াচে রোগ যা মূলত শ্বাসপ্রশ্বাসের মাধ্যমে ছড়ায়। শিশুদের ক্ষেত্রে এই রোগটি বেশি মারাত্মক হয়ে দেখা দিলেও সচেতনতার অভাবে বয়স্করাও ঝুঁকিতে পড়ছেন। বিশেষ করে যারা টিকার (রোগ প্রতিরোধক ইনজেকশন) আওতায় আসেননি, তাদের মধ্যেই মৃত্যুহার বেশি দেখা যাচ্ছে। দেশের বিভিন্ন প্রান্তে সংক্রমণের এই ঊর্ধ্বগতি রোধে দ্রুত টিকাদান কর্মসূচি জোরদার করার ওপর গুরুত্ব দিচ্ছেন সংশ্লিষ্টরা। একই সঙ্গে আক্রান্ত ব্যক্তিকে অন্যদের থেকে আলাদা রেখে সুষম খাবার ও পর্যাপ্ত তরল নিশ্চিত করার পরামর্শ দিচ্ছেন চিকিৎসকরা।
হামের এই ক্রমবর্ধমান সংক্রমণ এবং মৃত্যুহার আমাদের জনস্বাস্থ্য ব্যবস্থার জন্য একটি বড় চ্যালেঞ্জ। বিশেষ করে উপসর্গ নিয়ে মৃত্যুর উচ্চ হার নির্দেশ করছে যে, মাঠ পর্যায়ে রোগ শনাক্তকরণ এবং সঠিক চিকিৎসার ক্ষেত্রে এখনও কিছু ঘাটতি রয়ে গেছে। শিশুদের সুরক্ষায় অভিভাবকদের সচেতন হওয়া এবং সময়মতো প্রতিষেধক টিকা নিশ্চিত করাই এখন প্রধান লক্ষ্য হওয়া উচিত। সমাজ ও রাষ্ট্রের সম্মিলিত প্রচেষ্টা ছাড়া এই নীরব ঘাতক ব্যাধিকে রুখে দেওয়া সম্ভব নয়। আমাদের মনে রাখতে হবে, অবহেলা কেবল একটি প্রাণ নয়, পুরো পরিবারের ভবিষ্যৎ অন্ধকারে ঠেলে দিতে পারে।