দেশে হামের ক্রমবর্ধমান প্রাদুর্ভাব ও জীবনরক্ষাকারী টিকার তীব্র সংকটের জন্য পূর্ববর্তী সরকারগুলোর দীর্ঘমেয়াদী অবহেলা ও অদূরদর্শিতাকে দায়ী করেছেন স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণমন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন। শিশুদের এই প্রাণঝুঁকি থেকে রক্ষা করতে প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশে ৫ এপ্রিল থেকে সারা দেশে জরুরি ভিত্তিতে টিকাদান কর্মসূচি শুরু করা হয়েছে বলে তিনি সংসদকে আশ্বস্ত করেন।
সোমবার জাতীয় সংসদের অধিবেশনে এক জরুরি জনগুরুত্বপূর্ণ নোটিশের জবাবে স্বাস্থ্যমন্ত্রী দেশের বর্তমান স্বাস্থ্য পরিস্থিতির এই উদ্বেগজনক চিত্র তুলে ধরেন। ডেপুটি স্পিকার কায়সার কামালের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত এই অধিবেশনে রংপুর-৪ আসনের সংসদ সদস্য আখতার হোসেন দেশের বিভিন্ন স্থানে হামের প্রকোপ, বিশেষ করে শিশুদের আক্রান্ত হওয়া এবং হাসপাতালে নিবিড় পর্যবেক্ষণ কেন্দ্র বা আইসিইউ (গুরুতর অসুস্থ রোগীদের বিশেষ সেবা কেন্দ্র) সংকটের বিষয়টি উত্থাপন করেন।
মন্ত্রী তার বক্তব্যে বলেন, চিকিৎসা বিজ্ঞানের নিয়ম অনুযায়ী প্রতি চার বছর অন্তর অন্তর হাম ও রুবেলা (ত্বকের লালচে ফুসকুড়ি বা জার্মান হাম) টিকার বিশেষ প্রচারণা বা ক্যাম্পেইন হওয়ার কথা। কিন্তু অত্যন্ত পরিতাপের বিষয় যে, গত সাড়ে পাঁচ বছর ধরে দেশে এই ধরনের কোনো কর্মসূচি পরিচালিত হয়নি। এই দীর্ঘ বিরতির ফলে দেশের এক বিশাল সংখ্যক শিশু টিকার আওতা থেকে সম্পূর্ণ বাদ পড়ে গেছে। বর্তমানে যারা হামে আক্রান্ত হচ্ছে, তাদের একটি বড় অংশই এই টিকা না পাওয়া শিশু।
স্বাস্থ্যমন্ত্রী আরও অভিযোগ করেন যে, আগের সরকারের ভুল পরিকল্পনা ও টিকা মজুত সংক্রান্ত অদূরদর্শী সিদ্ধান্তের কারণে সরবরাহ ব্যবস্থায় বড় ধরনের জটিলতা তৈরি হয়েছিল। এর ফলে কেবল হাম নয়, বরং শিশুদের জন্য প্রয়োজনীয় আরও ছয়টি গুরুত্বপূর্ণ টিকার মজুত প্রায় শেষ হয়ে গিয়েছিল। এমন এক সংকটময় মুহূর্তে বর্তমান সরকার দায়িত্ব নিয়ে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে টিকা সংগ্রহের কাজ শুরু করেছে।
সংকট মোকাবিলায় সরকারের গৃহীত পদক্ষেপ সম্পর্কে সাখাওয়াত হোসেন জানান, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের বিশেষ দিকনির্দেশনায় ৫ এপ্রিল থেকেই দেশের ১৮টি জেলা এবং ৩০টি অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ উপজেলায় জরুরি টিকাদান কার্যক্রম শুরু হয়েছে। ৬ মাস থেকে ৫ বছরের কম বয়সী শিশুদের এই কর্মসূচির আওতায় আনা হচ্ছে। প্রথম ধাপে মোট ১২ লাখ শিশুকে টিকা দেওয়ার লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। অভিযানের প্রথম দিনেই ৩০টি উপজেলায় ৭৬ হাজার লক্ষ্যমাত্রার বিপরীতে ৭৩ হাজার শিশুকে টিকা দেওয়া সম্ভব হয়েছে, যার সাফল্যের হার প্রায় ৯৬ শতাংশ।
আগামী দিনের কর্মসূচি সম্পর্কে মন্ত্রী সংসদকে অবহিত করেন যে, ১২ এপ্রিল থেকে ঢাকা, ময়মনসিংহ ও বরিশাল সিটি করপোরেশন এলাকায় এবং ৩ মে থেকে পর্যায়ক্রমে সারা দেশের অবশিষ্ট এলাকাগুলোতে এই টিকাদান অভিযান শুরু হবে।
হাসপাতালগুলোতে চিকিৎসার সুযোগ-সুবিধা বৃদ্ধির বিষয়ে তিনি জানান, সারা দেশের সরকারি হাসপাতালগুলোতে সংক্রমিত শিশুদের জন্য আলাদাভাবে রাখার ব্যবস্থা বা আইসোলেশন (সংক্রামক ব্যাধিগ্রস্তদের আলাদা রাখার বিশেষ কক্ষ) ওয়ার্ড প্রস্তুত করা হয়েছে। বিশেষ করে রাজশাহীতে নতুন করে ২৫০টি শয্যা তৈরি করা হচ্ছে। আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার নিশ্চিত করতে আন্তর্জাতিক উদরাময় গবেষণা কেন্দ্র, বাংলাদেশ বা আইসিডিডিআর,বি-র উদ্ভাবিত একটি সাশ্রয়ী অক্সিজেন প্রবাহ পদ্ধতি ব্যবহারের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। মাত্র ৩০০ টাকা খরচে তৈরি এই যন্ত্রের মাধ্যমে শিশুদের ফুসফুসে সরাসরি অক্সিজেন সরবরাহ করা সম্ভব হবে, যা জীবন রক্ষায় কার্যকর ভূমিকা রাখবে।
সংসদ অধিবেশনে সংসদ সদস্য আখতার হোসেন একটি সম্পূরক প্রশ্নে মাঠপর্যায়ের অব্যবস্থাপনার অভিযোগ আনেন। তিনি বলেন, কাগজে-কলমে সব ঠিক থাকলেও সাধারণ মানুষ অনেক সময় হাসপাতালে গিয়ে প্রয়োজনীয় সেবা বা শয্যা পায় না। এছাড়া স্বাস্থ্য খাতের জন্য বরাদ্দকৃত বাজেটের একটি বড় অংশ খরচ করতে না পারার বিষয়টিকে তিনি মন্ত্রণালয়ের ব্যর্থতা হিসেবে উল্লেখ করেন। তিনি জানান, ২০২৪-২৫ অর্থবছরেও প্রায় ১১ হাজার কোটি টাকা অব্যয়িত রয়ে গেছে।
উত্তরে স্বাস্থ্যমন্ত্রী জানান, করোনার সময়ের অব্যয়িত ৬০৪ কোটি টাকা দিয়ে জরুরি ভিত্তিতে জাতিসংঘ শিশু তহবিল বা ইউনিসেফ থেকে অতিরিক্ত হামের টিকা সংগ্রহ করা হচ্ছে। ভবিষ্যতে যাতে এই ধরনের কোনো টিকার ঘাটতি তৈরি না হয়, সে বিষয়ে মন্ত্রণালয় এখন থেকে অত্যন্ত সতর্ক। মাঠপর্যায়ে তদারকি বাড়াতে সকল স্বাস্থ্যকর্মীর ছুটি বাতিল করা হয়েছে এবং বিশ্বব্যাংকসহ আন্তর্জাতিক উন্নয়ন সহযোগীদের সঙ্গে সমন্বয় জোরদার করা হয়েছে।
হামের মতো একটি প্রতিরোধযোগ্য রোগের ফিরে আসা আমাদের জনস্বাস্থ্য ব্যবস্থার জন্য একটি বড় সতর্কবার্তা। দীর্ঘ কয়েক বছরের টিকাদানের ঘাটতি যে কত বড় বিপর্যয় ডেকে আনতে পারে, বর্তমান পরিস্থিতি তার প্রমাণ। তবে কেবল সরকারের কর্মসূচিই যথেষ্ট নয়; প্রতিটি অভিভাবককে তাদের সন্তানের সুরক্ষা নিশ্চিত করতে টিকাদান কেন্দ্রে নিয়ে আসতে হবে। একইসঙ্গে স্বাস্থ্য খাতের অব্যয়িত বাজেটের সঠিক ব্যবহার এবং তৃণমূল পর্যায়ে সেবার মান নিশ্চিত করা গেলে তবেই ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে এমন মরণব্যাধি থেকে রক্ষা করা সম্ভব হবে।