দেশের বর্তমান রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট ও ব্যাংকিং খাতের অস্থিরতা নিয়ে সরকারকে কঠোর হুঁশিয়ারি দিয়েছেন বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর আমির ও জাতীয় সংসদের বিরোধীদলীয় নেতা ডা. শফিকুর রহমান। জুলাই গণঅভ্যুত্থানের চেতনাকে তুচ্ছতাচ্ছিল্য করলে আগের সরকারের চেয়েও ভয়াবহ পরিণতি ভোগ করতে হবে বলে তিনি সতর্ক করেছেন।
সোমবার রাজধানীর ডিপ্লোমা প্রকৌশলী প্রতিষ্ঠানে (ডিপ্লোমা ইঞ্জিনিয়ার্স ইনস্টিটিউট) ১১ দলীয় ঐক্য আয়োজিত এক সেমিনারে প্রধান অতিথির বক্তব্যে জামায়াত আমির এসব কথা বলেন। ‘গণভোটের রায়ের বিরুদ্ধে সরকার: সংকটের মুখোমুখি দেশ’ শীর্ষক এই সভায় তিনি সমসাময়িক রাজনীতির বিভিন্ন দিক নিয়ে তীব্র সমালোচনা করেন।
শফিকুর রহমান বলেন, বর্তমান সরকার জুলাই বিপ্লবের ফসল। জুলাই মাসের সেই গণঅভ্যুত্থান না থাকলে আজকের প্রধানমন্ত্রী, মন্ত্রী বা সংসদ সদস্যদের কোনো অস্তিত্ব থাকত না। তিনি ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, সংসদে এখন ফ্যাসিবাদের ছায়া দেখা যাচ্ছে। জনগণের সমস্যার কথা না বলে সেখানে ব্যক্তিবন্দনায় সময় ব্যয় করা হচ্ছে, যা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। তিনি স্পষ্ট করে জানান, সংসদে কারো জমিদারি বা পারিবারিক রাজতন্ত্র চলতে দেওয়া হবে না।
দেশের অর্থনৈতিক খাতের মেরুদণ্ড হিসেবে পরিচিত ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ পিএলসি-র সাম্প্রতিক পরিস্থিতি নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেন বিরোধীদলীয় নেতা। ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালককে বাধ্যতামূলক ছুটিতে পাঠানোর ঘটনাকে তিনি ব্যাংকটি পুনরায় কুক্ষিগত করার চেষ্টা হিসেবে অভিহিত করেন। তিনি বলেন, যে ব্যাংক দেশের মোট প্রবাসী আয়ের (রেমিট্যান্স) ৩২ শতাংশ জোগান দেয়, তার অস্তিত্ব সংকটে পড়লে দেশের অর্থনীতি মুখ থুবড়ে পড়বে। ব্যাংক খাতকে দলীয়করণের চেষ্টা চললে জামায়াতে ইসলামী চুপ করে বসে থাকবে না বলেও তিনি হুঁশিয়ারি দেন।
সেমিনারে ডা. শফিকুর রহমান গণভোটে অনুমোদিত ‘জুলাই সনদ’ বাস্তবায়নের ওপর জোর দেন। তিনি দাবি করেন, জুলাই সনদের আকাঙ্ক্ষা অনুযায়ী সাংবিধানিক সংস্কারের আন্দোলন শুরু হয়ে গেছে এবং এই দাবি আদায় না হওয়া পর্যন্ত তা থামবে না। মন্ত্রীদের সমালোচনা করে তিনি বলেন, সরকারের অস্থিরতার নেপথ্যে অন্য কারো ইশারা রয়েছে। প্রয়োজনে অধিকার আদায়ের লড়াইয়ে সংসদ থেকে পদত্যাগ করার সম্ভাবনাও নাকচ করে দেননি তিনি।
বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের প্রধান (আমির) মাওলানা মামুনুল হকের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত এই সেমিনারে আরও বক্তব্য রাখেন লিবারেল ডেমোক্রেটিক পার্টির (এলডিপি) সভাপতি কর্নেল (অব.) অলি আহমদ, রাষ্ট্রবিজ্ঞানী দিলারা চৌধুরী এবং আমার দেশ পত্রিকার সম্পাদক মাহমুদুর রহমান। মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন বিশিষ্ট আইনজীবী শিশির মনির। এছাড়াও এনসিপির আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম ও জামায়াতের সাধারণ সম্পাদক মিয়া গোলাম পরওয়ারসহ ১১ দলের জ্যেষ্ঠ নেতারা উপস্থিত ছিলেন।
জামায়াত আমিরের এই বক্তব্য দেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে নতুন মেরুকরণের ইঙ্গিত দিচ্ছে। বিশেষ করে ইসলামী ব্যাংকের নিয়ন্ত্রণ ও জুলাই সনদ বাস্তবায়ন নিয়ে সরকারের সাথে বিরোধী দলের দূরত্ব স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। অন্তর্বর্তীকালীন ব্যবস্থার পর গঠিত এই সরকার ও বিরোধী দলের মধ্যকার এই সংঘাতময় অবস্থান শেষ পর্যন্ত কোন দিকে মোড় নেয় এবং অর্থনীতির টালমাটাল অবস্থায় বড় ব্যাংকগুলোর নিরাপত্তা কতটুকু নিশ্চিত হয়, সেটিই এখন দেখার বিষয়।